পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ও দুস্থ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ (Annapurna Yojana) বা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার। এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো যোগ্য নারীদের প্রতি মাসে নগদ ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। রাজ্য সরকারের এই বড় সিদ্ধান্তের ফলে নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে। সম্প্রতি এই প্রকল্পের নতুন আবেদনকারীদের টাকা পাওয়ার সময়সীমা নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ১ জুন থেকে রাজ্যজুড়ে নতুন করে এই সুবিধা (Annapurna Yojana) পাওয়ার জন্য ফর্ম ফিলআপের প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। ৩ তারিখ থেকে প্রচুর মহিলা এই প্রকল্পের টাকা ও পেয়ে গেছেন। এই প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে থাকা নানা প্রশ্নের সঠিক উত্তর নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
Annapurna Yojana – অনলাইন ও অফলাইনে চালু অন্নপূর্ণা যোজনা
নারীদের সুবিধার্থে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার বা অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদন প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত সহজ এবং সর্বজনীন করে তোলা হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যের যোগ্য প্রার্থীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনলাইন এবং অফলাইন—এই দুই মাধ্যমেই নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারছেন। অনেকেই ইন্টারনেটের জটিলতা এড়াতে অফলাইন বা কাগজের ফর্ম পূরণ করাকেই বেশি পছন্দ করেন। আবার বর্তমান প্রজন্মের প্রযুক্তি সচেতন নারীরা ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন সারতে ভালোবাসেন। দুই ধরনের উপভোক্তার কথা মাথায় রেখেই প্রশাসন এই দ্বি-মুখী আবেদন ব্যবস্থার দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এর ফলে রাজ্যের প্রতিটি কোণায় থাকা যোগ্য মহিলারা খুব সহজেই এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন।
অফলাইনে কীভাবে আবেদন করবেন?
অফলাইন পদ্ধতিতে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোজনার সুবিধা পেতে গেলে আবেদনকারীকে প্রথমে নির্দিষ্ট সরকারি কার্যালয় থেকে ফর্ম সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী এই প্রকল্পের জন্য একটি বিশেষ ১২ পাতার আবেদনপত্র নির্দিষ্ট করা হয়েছে। উপভোক্তাদের এই নির্দিষ্ট ফর্মে নিজেদের ও পরিবারের সকলের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পূরণ করতে হবে। ফর্ম পূরণের পর এর সঙ্গে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জেরক্স কপি সংযুক্ত করতে হবে। সমস্ত নথিপত্র একসাথে বেঁধে নিকটবর্তী সরকারি ক্যাম্প, পঞ্চায়েত অফিস বা পুরসভায় গিয়ে জমা দিয়ে আসতে হবে। জমাদানের পর অফিস থেকে প্রাপ্ত রসিদটি ভবিষ্যতের প্রমাণ বা স্ট্যাটাস চেক করার জন্য নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দেবেন।
অনলাইনে কীভাবে আবেদন করবেন?
ডিজিটাল পদ্ধতিতে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম (Anna Purna Yojana Form Fill Up) পূরণ করতে চাইলে আবেদনকারীকে প্রথমে রাজ্য সরকারের নির্দিষ্ট অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। পোর্টালে গিয়ে নিজের সচল মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। এরপর স্ক্রিনে আসা ডিজিটাল আবেদনপত্রে নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত এবং ব্যাংকিং তথ্য নির্ভুলভাবে টাইপ করে বসাতে হবে। প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র যেমন—আধার কার্ড ও ব্যাংকের পাসবইয়ের প্রথম পাতার ছবি স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে। সাবমিট করার আগে পুরো ফর্মটি আরও একবার ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সবশেষে ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করলেই স্ক্রিনে একটি ইউনিক অ্যাপ্লিকেশন আইডি দেখা যাবে, যা সেভ করে রাখবেন।
আবেদনের কত দিন পর টাকা পাবেন?
নতুন আবেদনকারীদের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ফর্ম জমা দেওয়ার ঠিক কত দিন পর ব্যাংকে টাকা ঢুকবে? এই বিষয়ে বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, আবেদন করার পর যোগ্য নারীদের বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। সমস্ত কাগজপত্র জমা পড়ার পর যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে মাত্র ৭ থেকে ৮ দিনের মধ্যেই মিলবে টাকা। তবে এই কড়কড়ে ৩,০০০ টাকা সরাসরি নিজের অ্যাকাউন্টে পেতে হলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। উপভোক্তার নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে অতি অবশ্যই ‘ডিবিটি’ (Direct Benefit Transfer) বা আধার লিঙ্ক সক্রিয় থাকতে হবে। আধার কার্ডের সাথে ব্যাংকের সরাসরি সংযোগ না থাকলে টাকা পাঠাতে সমস্যা হতে পারে বা টাকা আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কারা টাকা পাবেন না?
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোজনার সুবিধা পেতে হলে আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে হবে, অন্যথায় আবেদন বাতিল হবে।
- যেসব নারীর বয়স ২৫ বছরের কম অথবা ৬০ বছরের বেশি, তারা এই প্রকল্পের অধীনে কোনো টাকা পাবেন না।
- আগেকার প্রকল্পে ভুয়ো তথ্য দিয়ে যারা বেআইনিভাবে সুবিধা নিচ্ছিলেন, তারা এবার টাকা পাবেন না।
- তাদের চিহ্নিত করতে এবার কড়া স্ক্রুটিনির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
- যদি কোনো আবেদনকারী সরকারি চাকরিজীবী হন বা নিয়মিত মোটা অঙ্কের পেনশন পান, তবে তিনিও টাকা পাবেন না।
- ব্যাংকের নথিতে ভুল থাকলে বা অ্যাকাউন্টটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট হলেও টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেবে।
- সঠিক ভেরিফিকেশনে যাদের তথ্য ভুয়া প্রমাণিত হবে, তাদের আবেদনপত্র সরাসরি বাতিল বলে গণ্য করা হবে।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের নারীদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার যোজনা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ (Annapurna Yojana) নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আগে যেখানে মহিলারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাধ্যমে কম টাকা পেতেন, এখন সেখানে একলাফে ৩,০০০ টাকা পাওয়া তাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় স্বস্তি আনবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এবার ভুয়ো উপভোক্তাদের রুখতে কড়া নজরদারি ও ভেরিফিকেশনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। যারা সততার সাথে নিয়ম মেনে আবেদন করবেন, তারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই সরকারি ভাতার সুফল নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পেয়ে যাবেন। পরিশেষে বলা যায়, সঠিক উপভোক্তাদের হাতে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ (Annapurna Yojana) এর এই অর্থ পৌঁছালে তা রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির বুনিয়াদকে আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করে তুলবে।
