পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প হলো অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana). রাজ্যের দরিদ্র ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলির আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে লক্ষ্মীর ভান্ডারের বদলে এই প্রকল্প চালু করা হয়। তবে সম্প্রতি এই প্রকল্পের উপভোক্তা নির্বাচন ও নথিপত্র যাচাইকরণের কাজ (Annapurna Yojana Verification) ঘিরে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে যাচাইয়ের কাজে নিযুক্ত কর্মীদের সুরক্ষাহীনতা ও ক্ষোভের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্থবিরতা এসেছে। যে কারনে টাকা পেতে ও দেরি হচ্ছে, অনেক মহিলার।
Annapurna Yojana Verification – অন্নপূর্ণা যোজনায় টাকা পাওয়ার প্রসেস
অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা (Annapurna Yojana Benefits) পেতে হলে আবেদনকারীকে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়:
- আবেদনপত্র জমা: প্রথম ধাপে সঠিক নথিপত্র ও ব্যক্তিগত বিবরণসহ আবেদনকারীকে পঞ্চায়েত, পৌরসভা বা নির্দিষ্ট সরকারি ক্যাম্পে আবেদনপত্র জমা দিতে হয়
- প্রাথমিক স্ক্রুটিনি: জমা পড়া আবেদনপত্রগুলির প্রাথমিক তথ্য সরকারি পোর্টালে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত ও পরীক্ষা করা হয়।
- মাঠ পর্যায়ে যাচাইকরণ (Physical Verification): আবেদনকারী সত্যিই প্রকল্পের যোগ্য কি না, তা যাচাই করতে কর্মীরা সরাসরি আবেদনকারীর বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।
- চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন: স্থান যাচাইয়ের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে প্রশাসন যোগ্য উপভোক্তাদের চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করে।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা: সব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফারের (DBT) মাধ্যমে উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যায়।
অন্নপূর্ণা যোজনা ভেরিফিকেশন কারা করে?
সাধারণত গ্রাম ও শহর এলাকায় মাঠ পর্যায়ে গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী (ICDS Workers) ও সহায়িকাদের ওপর। স্থানীয় এলাকার পরিবারগুলির সাথে তাঁদের পরিচিতি থাকার কারণে প্রশাসন এই কাজের দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত করে। অনেক জায়গায় তাঁদের সাথে পঞ্চায়েত বা পৌরসভার প্রতিনিধি কিংবা ভিলেজ পুলিশ কর্মীদের যুক্ত রাখার কথা বলা থাকে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের একাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই যাচাইকরণের কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
অন্নপূর্ণা যোজনা ভেরিফিকেশন কেন করতে চাইছে না
সম্প্রতি রাজ্য জুড়ে বিশেষ করে হুগলি ও অন্যান্য জেলায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা এই ভেরিফিকেশনের কাজ বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে:
- সুরক্ষার অভাব: কোনো সরকারি আধিকারিক ছাড়া একা একা গ্রামে গিয়ে ভেরিফিকেশন করতে গিয়ে কর্মীরা স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন।
- জনরোষের ভয়: যেসব আবেদনকারীর নাম বাতিল হচ্ছে বা টাকা পাননি, তাঁরা সরাসরি নিচু তলার এই কর্মীদের দায়ী করছেন ও গালিগালাজ করছেন।
- অতিরিক্ত কাজের চাপ: অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র পরিচালনা ও শিশুদের পুষ্টিসংক্রান্ত নিজস্ব কাজের পাশাপাশি এই জটিল দায়িত্ব পালন করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- শারীরিক নিগ্রহের আশঙ্কা: মাঠ পর্যায়ে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কর্মীরা শারীরিক নিগ্রহের আতঙ্কে ভুগছেন এবং একা কাজ করতে অস্বীকার করছেন।
এই কারনে টাকা পেতে দেরি হচ্ছে?
হ্যাঁ, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের এই আন্দোলন ও কাজ বয়কটের কারণে প্রকল্পের সার্বিক কাজ থমকে গেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও Annapurna Yojana Verification পোর্টালে জমা দেওয়ার কাজ বন্ধ থাকায় হাজার হাজার আবেদনপত্র প্রশাসনিক দপ্তরে আটকে পড়ে রয়েছে। যতক্ষণ না মাঠ পর্যায়ের যাচাইকরণ সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ প্রশাসনিক আধিকারিকেরা চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করতে পারছেন না। ফলে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃত যোগ্য উপভোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে।
সরকারি পদক্ষেপ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জট কাটাতে জেলা ও ব্লক প্রশাসন একাধিক জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে:
- সুরক্ষার আশ্বাস: আন্দোলনকারী কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিডিও এবং স্থানীয় থানার সাথে আলোচনা চালানো হচ্ছে।
- যৌথ দল গঠন: অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের একা না পাঠিয়ে পঞ্চায়েতের কর্মী বা পুলিশ কর্মকর্তা সমন্বয়ে একটি যৌথ টিম গঠন করে ভেরিফিকেশনে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
- প্রশাসনিক বৈঠক: জেলাভিত্তিক স্মারকলিপি পাওয়ার পর মহকুমা শাসক (SDO) ও ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকেরা (BDO) ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসেছেন।
- জরুরি নির্দেশিকা: কাজ দ্রুত শেষ করতে এবং উপভোক্তাদের হয়রানি কমাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধানের বার্তা দিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
উপসংহার
অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana) সমাজের সাধারণ ও অসচ্ছল মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক অনন্য উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তার অভাব ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে এই ভালো উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং তাঁদের সাথে প্রশাসনিক আধিকারিকদের রেখে যৌথভাবে কাজ করলে খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিলে যোগ্য উপভোক্তারা সময়মতো আর্থিক সহায়তা পাবেন এবং প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য সফল হবে।