পশ্চিমবঙ্গে চলছে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযান। এরই মধ্যে সরকারি ভাবে ভারতীয় রেলস্টেশনে দোকান খুলতে কি কি লাগে (Railway Station Shop License)? ভারতীয় রেলের হকার লাইসেন্স কিভাবে (IRCTC License) পাওয়া যায়? ও কিভাবে কিভাবে আবেদন করবেন এই প্রতিবেদন থেকে বিস্তারিত জেনে নিন।
Railway Station Shop License Procedure
ভারতীয় রেলওয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি যাত্রীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে থাকে। এই বিপুল সংখ্যক যাত্রীদের যাতায়াতের সময় বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং খাবারের বিশেষ চাহিদা তৈরি হয়। রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা দোকান গড়ে তুলতে পারলে তা অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা হতে পারে। অনেকেই আছেন যারা স্টেশনে নিজেদের চায়ের দোকান, বইয়ের স্টল বা খাবারের কাউন্টার খোলার স্বপ্ন দেখে থাকেন। তবে রেলের চত্বরে বাণিজ্যিক আউটলেট স্থাপন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু আইনি প্রক্রিয়া এবং সরকারি নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আপনি সম্পূর্ণ আইনি উপায়ে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।
রেলষ্টেশনে এবার থেকে কেবল অনুমোদিত দোকান থাকবে
রেলযাত্রীদের সুরক্ষার্থে এবং প্ল্যাটফর্মের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ভারতীয় রেল বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখন থেকে যেকোনো রেলস্টেশন চত্বরে কেবল প্রশাসনের দ্বারা অনুমোদিত এবং বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানগুলিই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে। অনুমতি ব্যতীত (Railway Station Shop License) রেলের জমিতে বা প্ল্যাটফর্মের যেকোনো অংশে দোকান দেওয়া বা হকারি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। বেআইনি ব্যবসা বন্ধ করতে রেলওয়ে সুরক্ষা বল বা RPF নিয়মিত বিভিন্ন স্টেশনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। যাত্রীদের স্বাস্থ্যকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কালোবাজারি রুখতে এই অনুমোদন ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই স্বস্তিতে ও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা করতে চাইলে রেলের নির্ধারিত আইনি পথ অনুসরণ (Railway Station Shop License) করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
৩) দোকান খুলতে সরকারি অনুমতি
রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে যেকোনো ধরনের দোকান বা স্টল খোলার জন্য Railway Station Shop License ও কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠি পূরণ করা বাধ্যতামূলক। প্রথমত, আবেদনকারী ব্যবসায়ীকে অবশ্যই একজন আইনি ভারতীয় নাগরিক হতে হবে এবং তার নথিপত্র বৈধ হতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য আগ্রহী ব্যক্তির বয়সসীমা ন্যূনতম ১৮ বছর বা তার বেশি হওয়া আবশ্যক। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি কোনো ফৌজদারি মামলা বা পুলিশি রেকর্ড থাকে তবে তিনি আবেদনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থেই রেল প্রশাসন আবেদনকারীদের পূর্বসূরি বা ব্যাকগ্রাউন্ড ভালোভাবে যাচাই করে নেয়। এই সমস্ত মৌলিক সরকারি শর্তাবলী পূরণ করার পরেই একজন ব্যক্তি পরবর্তী লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার জন্য এগিয়ে যেতে পারেন।
৪) অনুমতি কিভাবে নেবেন
রেলস্টেশনে দোকান বরাদ্দ করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বা Railway Station Shop License Procedure অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং এটি মূলত অনলাইন টেন্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আগ্রহী ব্যবসায়ীদের নিয়মিতভাবে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম বা আইআরইপিএস (IREPS) নামক অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে নজর রাখতে হবে। যখনই কোনো স্টেশনের জন্য নতুন টেন্ডার (Railway Station Stall Tender) বা বিজ্ঞপ্তির ঘোষণা করা হয়, তখন সেখান থেকে নির্দিষ্ট ফর্ম ডাউনলোড করতে হয়। আবেদনকারীকে সেই টেন্ডার ডকুমেন্টের সমস্ত শর্তাবলী মনোযোগ সহকারে পড়ে অনলাইনের মাধ্যমে নিজের দরপত্র বা বিড সাবমিট করতে হবে। আবেদনের সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্নেস্ট মানি ডিপোজিট বা ইএমডি (EMD) অর্থ হিসেবে জমা দিতে হয়। পরবর্তীতে স্ক্রুটিনি এবং বিডিং প্রক্রিয়ার শেষে যে যোগ্য ব্যবসায়ী সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হন, তাকেই লাইসেন্স দেওয়া হয়।
৫) কি কি নথি লাগবে?
রেলওয়ে লাইসেন্স বা স্টলের পারমিট (Railway Station Stall Permission) পাওয়ার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জমা দেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক। ব্যক্তিগত পরিচয় এবং ঠিকানার প্রমাণপত্র হিসেবে আবেদনকারীর বৈধ আধার কার্ড এবং প্যান কার্ডের কপি জমা দিতে হবে। আর্থিক স্বচ্ছতা ও সক্ষমতা প্রমাণের জন্য ব্যবসায়ীর বিগত কয়েক মাসের ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আবেদনকারীকে তার বিগত কয়েক বছরের আয়কর রিটার্ন বা আইটিআর (ITR) সংক্রান্ত নথিপত্র প্রদর্শন করতে হয়। এছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় পুরসভা বা পঞ্চায়েতের ব্যবসায়িক ট্রেড লাইসেন্স এবং চারিত্রিক শংসাপত্রের প্রয়োজন হতে পারে। সমস্ত কাগজপত্র সঠিক এবং আপ-টু-ডেট থাকলে লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ এবং দ্রুত সম্পন্ন হয়।
৬) কত টাকা লাগবে?
রেলস্টেশনে দোকান খোলার খরচ মূলত স্টেশনের ভৌগোলিক অবস্থান, যাত্রী সংখ্যা এবং দোকানের আকারের ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে একটি ছোট চায়ের দোকান, কফির স্টল কিংবা বইয়ের দোকান চালু করতে প্রাথমিক খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। বড় বা জংশন স্টেশনগুলির ক্ষেত্রে এই খরচের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পায় কারণ সেখানে লাইসেন্স ফি এবং সিকিউরিটি ডিপোজিট বেশি থাকে। প্রাথমিক খরচের পাশাপাশি ব্যবসায়ীকে প্রতি মাসে রেলের নির্ধারিত লাইসেন্স ফি এবং স্টলের মাসিক ভাড়া প্রদান করতে হয়। এছাড়াও টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সময় যে নিরাপত্তা আমানত বা আর্নেস্ট মানি জমা দিতে হয় তা মাথায় রাখা জরুরি। তাই স্টেশনে ব্যবসা শুরু করার আগে সম্পূর্ণ আর্থিক পরিকল্পনা এবং পুঁজির ব্যবস্থা করে রাখা অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৭) উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে ভারতীয় রেলস্টেশনে দোকান খোলা বর্তমান যুগে একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং সুরক্ষিত জীবিকা হতে পারে। রেলের নিয়মাবলী কঠোর হলেও সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না। অনলাইন টেন্ডার প্রক্রিয়ার কারণে এখন সাধারণ মানুষও কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাচ্ছেন। বৈধ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা করলে আইনি জটিলতার কোনো ভয় থাকে না এবং শান্তিতে প্রতিদিন আয় করা সম্ভব হয়। আপনার যদি নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও পুঁজি থাকে, তবে আজই আইআরইপিএস পোর্টালে গিয়ে উপযুক্ত টেন্ডারের সন্ধান শুরু করতে পারেন। সঠিক পরিকল্পনা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রেলের প্ল্যাটফর্মে গড়ে ওঠা আপনার ব্যবসাটি ভবিষ্যতে ব্যাপক সাফল্য লাভ করতে পারে।