পশ্চিমবঙ্গের রেশন ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল, আধুনিক এবং গ্রাহকবান্ধব করতে সম্প্রতি রেশন কার্ড নিয়ে (Ration Card) এক বড়সড় উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের খাদ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই রেশন দুর্নীতি কড়া ভাবে দমন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তার মধ্যেই অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলারস ফেডারেশনের পক্ষ থেকে রাজ্যের প্রশাসনিক স্তরে একটি বিশেষ আবেদনপত্র পেশ করা হয়েছে। যেখানে কেন্দ্র সরকারের রেশন প্রকল্পে যে সমস্ত উন্নত সুবিধা দেওয়া হয়, সেগুলো পশ্চিমবঙ্গেও যেন চালু করা হয়। এই কেন্দ্রীয় রেশন প্রকল্প চালু হলে রেশন কার্ডের মাধ্যমে রান্নার গ্যাস, ব্যাংকিং পরিষেবা থেকে শুরু করে এক গুচ্ছ নতুন নতুন সুবিধা পাবেন।
Ration Card – আগে রেশনে কি কি সুবিধা দেওয়া হতো?
ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের রাজ্যের রেশন ব্যবস্থা মূলত একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আগে ডিজিটাল রেশন কার্ড (Digital Ration Card) বা কুপনের মাধ্যমে উপভোক্তাদের শুধুমাত্র চাল, গম, আটা, চিনি এবং কেরোসিন তেলের মতো কিছু জরুরি খাদ্যশস্য ও জ্বালানি বণ্টন করা হতো। সাধারণ মানুষ মাসে নির্দিষ্ট কয়েক দিন লাইনে দাঁড়িয়ে এই সস্তা দরের খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতেন। ডিলারদের কাজও ছিল শুধু এই খাদ্যশস্য মেপে উপভোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া এবং তার হিসাব সরকারের কাছে জমা রাখা। এর বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য অতিরিক্ত কোনো বাণিজ্যিক বা ডিজিটাল পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ রেশনে ছিল না।
কেন্দ্র সরকার অতিরিক্ত কি কি সুবিধা দেয়
ভারতের অন্যান্য অনেক প্রগতিশীল রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় রেশন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। সেখানে রেশন দোকানগুলি আর কেবল খাদ্যশস্য বিতরণের কেন্দ্র নয়, বরং এক একটি মিনি-সুপারমার্কেটে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় নিয়মানুযায়ী, সেখানে সাধারণ মানুষ বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে বিভিন্ন কোম্পানির নিত্যপ্রয়োজনীয় প্যাকেটজাত পণ্য কিনতে পারেন। এর পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার মানুষের সুবিধার্থে ৫ কেজির ছোট রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারও রেশন দোকান থেকে সরাসরি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া উতসমের মরসুমে বাড়তি রেশন ও আর্থিক প্যাকেজ ও ঘোষণা করা হয়। যা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বরাবরই বঞ্চিত হয়ে আসছে।
পশ্চিমবঙ্গে নতুন কি কি সুবিধার প্রস্তাব
পশ্চিমবঙ্গের রেশন পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজাতে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিষেবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে রেশন দোকানগুলিকে ‘কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট’ বা Bank Mitra হিসেবে ব্যবহার করে গ্রামীণ ব্যাংকিং পরিষেবা চালু করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ রেশন দোকানে এসেই টাকা তোলা, জমা দেওয়া বা ডাক বিভাগের জরুরি কাজ মেটাতে পারবেন। এছাড়া চাল-গমের পাশাপাশি ডাল, ভোজ্য তেল এবং অন্যান্য প্যাকেটজাত সামগ্রী কম দামে বিক্রি করার ছাড়পত্রও চাওয়া হয়েছে এই নতুন আবেদনে। কম দামে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার, উজ্জলা যোজনার সুবিধা প্রভৃতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রেশন ডিলারদের সুবিধা ও দাবি
রেশন কার্ডের নতুন নিয়ম ২০২৬ বা নতুন এই বহুমুখী ব্যবস্থা চালু হলে রেশন ডিলারদের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রেশন ডিলারদের মূল দাবি হলো, কেন্দ্রীয় নিয়মে তাদের লভ্যাংশ বা কমিশন সম্মানজনকভাবে বৃদ্ধি করা হোক, যাতে তারা সততার সঙ্গে ব্যবসা চালাতে পারেন। পাশাপাশি, ডিজিটাল ও ব্যাংকিং পরিষেবাগুলি সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য ডিলারদের সরকারি খরচে বিশেষ কারিগরি ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। ডিলারদের একাংশের মতে, আয়ের উৎস মজবুত হলে রেশন বন্টনে দুর্নীতির অবকাশও পুরোপুরি দূর হবে।
বাস্তবায়ন হলে কি কি সুবিধা পাওয়া যাবে
এই প্রস্তাবটি পশ্চিমবঙ্গের রেশন ব্যবস্থায় বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের সামান্য ব্যাংকিং কাজ বা গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য আর মাইলের পর মাইল কষ্ট করে শহরের দিকে ছুটে যেতে হবে না। ঘরের কাছে এক ছাদের নিচেই মিলবে খাদ্যশস্য, ব্যাংকিং ও পোস্টাল পরিষেবা, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক ধাক্কায় অনেকটা চাঙ্গা করে তুলবে। এছাড়াও, রেশন দোকানগুলির বাণিজ্যিক পরিধি বাড়লে স্থানীয় স্তরে বেকার যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
আরও পড়ুন, পিএম কিষাণ ও সমস্ত সরকারি প্রকল্পের পরবর্তী কিস্তির টাকা কবে দেওয়া হবে?
রাজ্য সরকারের প্রতিক্রিয়া
পূর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প চালুর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে তৎকালীন রাজ্য সরকার। উল্টে নতুন প্রকল্প চালু করে পাহার প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে। খাদ্যমন্ত্রী গ্রেপ্তার হয়েছেন, আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। যার ফল ভুগতে হয়েছে সাধারণ জনগণকে। তবে বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে এই জটিল জট কাটার একটি পজিটিভ ইঙ্গিত মিলছে। ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা আশা করছেন, নতুন সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে এই আধুনিকীকরণের প্রস্তাবে দ্রুত সবুজ সংকেত দেবে। বিশেষ করে খাদ্য দপ্তরের অন্দরের সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে অভিজ্ঞ শীর্ষ আমলারাও এই বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রেশন ব্যবস্থাকে গ্রাহকবান্ধব রেশন পরিষেবা ও ডিজিটাল ও বহুমুখী করে তোলা সাধারণ মানুষের স্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। খাদ্য সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন রাজ্যের জনগনের প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করবে।রেশন ডিলারদের দাবি এবং সাধারণ মানুষের প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে রাজ্য সরকার দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা। এই সংস্কার সফল হলে পশ্চিমবঙ্গের রেশন ব্যবস্থা সমগ্র দেশের বুকে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।