পশ্চিমবঙ্গের সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক পরিকাঠামো উন্নত করতে বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প (Vidyanjali Scheme) চালুর মাধ্যমে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের জনপ্রিয় শিক্ষামূলক কর্মসূচি বিদ্যাঞ্জলি পোর্টাল (Vidyanjali Portal) এবার আনুষ্ঠানিকভাবে রূপায়িত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের বুকে। রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তের বিদ্যালয়গুলোতে এই বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে শুরু হয়ে গেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আনন্দময় ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই নতুন উদ্যোগের ফলে ছাত্রছাত্রীদের মেধা বিকাশ এবং বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত রূপান্তর ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Vidyanjali Scheme in West Bengal
পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যাঞ্জলি পোর্টাল (Vidyanjali Portal) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আধুনিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এই বিশেষ কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য হলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আঙিনায় সরাসরি যুক্ত করা। এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থা এবং সহৃদয় ব্যক্তিরা বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অংশ নিতে পারবেন। তারা কেবল অর্থ দিয়ে নয়, বরং নিজেদের মেধা, অভিজ্ঞতা এবং নানাবিধ প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদানের মাধ্যমেও সাহায্য করতে পারবেন। ফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর পঠনপাঠনের পরিবেশ বেসরকারি স্কুলের মতোই আধুনিক এবং উন্নত মানের হয়ে উঠবে।
বিদ্যাঞ্জলি পোর্টাল কীভাবে কাজ করবে?
বিদ্যালয়গুলোর আধুনিকীকরণের জন্য শিক্ষা দপ্তর একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সুশৃঙ্খল পরিকাঠামো তৈরি করেছে। আগ্রহী কোনো ব্যক্তি বা সমাজসেবী প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে Vidyanjali Portal ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে হবে। এরপর প্রতিটি বিদ্যালয় তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের মধ্য থেকে উপযুক্ত ব্যক্তিদের বেছে নিতে পারবে। স্কুল শিক্ষা দপ্তর প্রথমে আবেদনকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে চূড়ান্ত কাজের অনুমতি দেবে। এরপরই স্বেচ্ছাসেবীরা সরাসরি বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডেন্স, বিশেষ প্রশিক্ষণ কিংবা ডিজিটাল পড়াশোনার ক্ষেত্রে সাহায্য করার সুযোগ পাবেন।
বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো গঠনে সহযোগিতা
এই অভিনব কর্মসূচির সুবাদে রাজ্যের প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার অভাব অনেকটাই দূর করা সম্ভব হবে। বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের আধুনিক বেঞ্চ থেকে শুরু করে উন্নত মানের কম্পিউটার, ক্রীড়া সামগ্রী এবং ল্যাবরেটরির ডিজিটাল সরঞ্জাম এই প্রকল্পের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যাবে। তাছাড়া ভবনের সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতির মতো জরুরি কাজগুলোতেও সমাজসেবীরা সরাসরি সাহায্য করার সুবর্ণ সুযোগ পাবেন।
সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এই যৌথ অংশগ্রহণের ফলে গ্রামীণ ও শহরের বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পরিকাঠামোগত বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসবে। শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার আলো পাওয়ার মাধ্যমে নিজেদের যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যোগ্য করে তুলতে পারবে।
স্কুল ব্যাগ পলিসি ২০২০ এর প্রয়োগ
নতুন শিক্ষানীতির আলোকেই রাজ্য সরকার শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একগুচ্ছ নতুন নিয়মাবলি জারি করেছে। স্কুল শিক্ষা দপ্তরের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী, ২০২০ সালের জাতীয় স্কুল ব্যাগ নীতি প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এখন থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিত্যদিনের স্কুল ব্যাগের মোট ওজন কোনোভাবেই তাদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। প্রাক-প্রাথমিক বা একদম ছোট শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ ‘নো ব্যাগ’ বা ব্যাগবিহীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আপার প্রাইমারি ও হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ভারী ব্যাগের বোঝা বহনের চিরাচরিত নিয়ম চিরতরে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ট্রলি ব্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা
শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ যাতে ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়ে বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সচেতন ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান সময়ে বহু শিক্ষার্থী চাকাযুক্ত বা ট্রলি স্কুল ব্যাগ ব্যবহার করে, যা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বড়সড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে স্কুল শিক্ষা দপ্তর চাকাওয়ালা ব্যাগ ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর পাশাপাশি সমস্ত বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যসম্মত মিড ডে মিলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করার জন্য জেলা স্তরের আধিকারিকদের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন, সকলকে অন্নপূর্ণা ভান্ডার ভেরিফিকেশন করতে হবে। কিভাবে করবেন?
বিদ্যালয়ে ব্যাগহীন দিবস বা ব্যাগলেস ডে
শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলতে নতুন শিক্ষা নির্দেশিকায় ‘ব্যাগলেস ডে’ বা ব্যাগহীন দিবস পালনের ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষার্থীরা কোনো বই-খাতার বোঝা ছাড়াই সম্পূর্ণ মুক্ত মনে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারবে। সেদিন প্রথাগত পড়াশোনার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কাজ, খেলাধুলা, ক্যুইজ এবং নান্দনিক চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটানো হবে। এই ধরণের আধুনিক চিন্তাভাবনা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর করতে সাহায্য করবে। সামগ্রিকভাবে, বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্পের এই চমৎকার মেলবন্ধন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চলেছে।