পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া ডিএ (Dearness Allowance) সংক্রান্ত মামলার শুনানি (DA Case hearing) শেষ হয়েছে। এবার রাজ্য সরকারি কর্মীদের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court of India) এই মামলার রায় ঘোষণা (DA Case Judgement) হবে। আর নবান্নের আজকের বিবৃতির পর রায়দান আরও এগিয়ে এলো। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার রাজ্য সরকারি কর্মীদের কেন কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেয় না এবং কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বা যুক্তি কতখানি, এই বিষয়ে নিজেদের যুক্তি, প্রমাণ সহ আদালতে জমা করলো নবান্ন। এবার রাজ্য সরকারি কর্মীদের নথি জমার পরই রায় ঘোষণা হবে। তবে রাজ্য সরকারের দেওয়া এই নথি সরকারি কর্মীদের কার্যত নতুন করে চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে। এবার নবান্ন কি নথি জমা দিলো এবং বকেয়া ডিএ মামলার ভবিষ্যৎ কি হতে পারে, বিস্তারিত জেনে নিন।
Dearness Allowance Case Update
DA মামলার সর্বশেষ শুনানির দিন আদালত, উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত জানায়, ২ সপ্তাহের মধ্যে উভয় পক্ষকে নিজেদের স্বপক্ষে যুক্তি, লিখিত আকারে জমা দিতে। প্রথমে রাজ্য সরকার জমা দেবে, তার ১ সপ্তাহের মধ্যে মামলাকারীরা ও জমা দেবে। আর আজ নিজেদের নথি আদালতে জমা দিলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার (Government of West Bengal). নবান্নের এই সমাপনী বিবৃতি অনেকটাই নির্ভর করছে, এই মামলার রায় কি হবে। আর রাজ্যের যুক্তি আদালত কতটা যুক্তিযুক্ত মনে করে। এছাড়া এই যুক্তিকে খন্ডন করতে মামলাকারী সরকারি কর্মীরা কি কি যুক্তি উপস্থাপন করে।
কেন্দ্রীয় হারে ডিএ এর বিপক্ষে নবান্নের যুক্তি
রাজ্য সরকারি কর্মীরা AICPI বা কেন্দ্রীয় হারে ডিএ (Dearness Allowance) পাওয়ার দাবি করলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতা (DA) দেওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা রাজ্যের উপর নেই। সংবিধানের ৩০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা (Salary & Allowance) নির্ধারণের স্বাধীন অধিকার রয়েছে। কোনও রাজ্যের বা কেন্দ্রের কোন সার্ভিস রুলে লেখা নেই, যে সমস্ত রাজ্য কে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিতে হবে। রাজ্যের আর্থিক সামর্থ্য এবং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ডিএ নির্ধারিত হয়। সরকারি কর্মচারীদের জন্য ডিএ কোনও মৌলিক অধিকার নয় (DA is not a fundamental Right), বরং রাজ্যের নীতি ও বিজ্ঞপ্তির ওপর নির্ভর করে। নবান্নের দাবি, তারা কর্মচারীদের ডিএ (Dearness Allowance) থেকে বঞ্চিত করে না, তবে তা রাজ্যের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট আগেও এই বিষয়ে রাজ্যের পক্ষে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
AICPI হারে ডিএ না দেওয়া ১২টি রাজ্যের তালিকা জমা
পশ্চিমবঙ্গ সরকার সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, দেশের অন্তত ১২টি রাজ্য কেন্দ্রীয় হারে ডিএ প্রদান করে না। এই রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে কেরল, ছত্তীসগঢ়, হিমাচল প্রদেশ, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, তেলঙ্গানা এবং ত্রিপুরা। এই তালিকার অধিকাংশ রাজ্যে বিজেপি সরকার বা তাদের জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, কেবল কেরল ও কর্নাটক ব্যতিক্রম। রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বল জানান, আদালত জানতে চেয়েছিল কোন কোন রাজ্য ভোক্তা মূল্য সূচক (AICPI) মেনে ডিএ প্রদান করে না। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য, প্রমাণ সহকারে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের অর্ধেকেরও বেশি রাজ্য কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেয় না। তাই শীর্ষ আদালত কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়ার নির্দেশ দিলে, দেশের সমস্ত রাজ্য এর দ্বারা প্রভাবিত হবে। এই তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে রাজ্য তার অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে।
সিপিআই ও ডিএ হারে বৈষম্য
পশ্চিমবঙ্গ সরকার (Government of West Bengal) জানিয়েছে, যেসব রাজ্যের ‘রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাওয়েন্স’ (ROPA) নিয়মে AICPI এর উল্লেখ রয়েছে, সেখানেও ডিএ হারে পার্থক্য দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেক রাজ্যই কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেয় না। ছত্তীসগঢ়, মেঘালয়, হিমাচল প্রদেশ এবং সিকিমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রাজ্যগুলিতে সিপিআই মেনে ডিএ দেওয়া হলেও, কেন্দ্রীয় হারে তারা ডিএ দেয় না। বিগত কয়েক বছরে ডিএ দেওয়ার তালিকা, প্রমাণ স্বরূপ রাজ্য সরকার আদালতে জমা দিয়েছে। যেখানে একেক রাজ্যের ডিএ দেওয়ার হার ভিন্ন। রাজ্যের আর্থিক অবস্থা, কর্মচারীদের জন্য অন্যান্য সুবিধা এবং অগ্রাধিকারের ওপর ভিত্তি করে ডিএ নির্ধারিত হয়। এই বৈষম্যের কারণে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়ার দাবি অযৌক্তিক বলে মনে করে রাজ্য সরকার।
মামলার পটভূমি ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা
কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের হারে রাজ্যকেও ডিএ দিতে হবে, এই দাবিতে মামলা (DA Case) শুরু হয়। স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (SAT) ও কলকাতা হাইকোর্ট হয়ে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছেছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষ হলেও রায় ঘোষণা স্থগিত রেখেছে শীর্ষ আদালত। আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, কোনও পক্ষের অতিরিক্ত বক্তব্য থাকলে তা লিখিত আকারে জমা দিতে হবে। সোমবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের বক্তব্য জমা দেয়, যাতে ডিএ-র বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। মামলাকারীদের পক্ষ থেকে পাল্টা বক্তব্য জমা দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন, সরকারি কর্মীদের একাউন্টে টাকা ঢুকবে। নবান্নের বড় ঘোষণা
মামলাকারীদের দাবি ও রাজ্যের যুক্তি
মামলাকারী সরকারি কর্মচারীদের দাবি, নির্দিষ্ট সময় অন্তর বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে ডিএ দেওয়া উচিত। তাদের মতে, খেয়ালখুশিমতো ডিএ দেওয়া যায় না, এবং বকেয়া ডিএ কিস্তিতে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, রাজ্যের যুক্তি, ডিএ কোনও মৌলিক অধিকার নয় এবং এটি বাধ্যতামূলক নয়। কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক পরিকাঠামো ভিন্ন, সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো ও ভিন্ন। তাই দিএ কিভাবে এক হতে পারে? কেন্দ্রে ৭ম বেতন কমিশন চলছে, পশ্চিমবঙ্গে ষষ্ঠ, তাহলে ডিএ কিভাবে এক হয়? তাই রাজ্য মনে করে, এই তুলনা অযৌক্তিক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দাবি করেছে, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তারা AICPI এর ভিত্তিতে নিজস্ব নীতি তৈরি করেছে। তবে, কেন্দ্রের হারে ডিএ দেওয়ার নির্দেশ ৩০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার কে লঙ্ঘন করে। এই ধারা অনুযায়ী রাজ্য সরকার তার কর্মীদের, সরকারের নীতি অনুযায়ী বেতন ও ভাতা দিতে পারে।
মামলাকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নথি জমার পর ইতিমধ্যেই সরকারি কর্মীদের আইনজীবীরা পাল্টা যুক্তি খন্ডনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এবার কয়েকদিনের মধ্যেই রাজ্য সরকার সমাপনী বিবৃতি জমা দেবে। আর এর পরই আদালতের রায় ঘোষণার পালা। এক দিকে আদালতের রায় ঘোষণার দিকে তাকিয়ে লাখ লাখ সরকারি কর্মী। অন্যদিকে রাজ্যের দাবি, তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করাও উচিত। এই মামলার রায় রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে ডিএ নীতির পার্থক্য (Dearness Allowance) নিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা, এই রায় (DA Case Judgement) তাদের দাবির পক্ষে যাবে।