পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২১ সালে তৃতীয়বার রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প (Lakshmir Bhandar Scheme) চালু করেন মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের মহিলারা প্রতি মাসে ১০০০ টাকা আর্থিক ভাতা পান, যা তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করে। এই প্রকল্প রাজ্যের সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলির মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী সংখ্যা এবং সরকারের ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়।
লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের সুবিধাভোগী ও রাজ্যের ব্যয়
পাথরপ্রতিমার তৃণমূল বিধায়ক সমীর জানা বিধানসভায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর জবাবে রাজ্যের নারী ও শিশু সমাজকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা জানান, ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যের ২ কোটি ১৫ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭৭৫ জন মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক সুবিধাভোগী মহিলাদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৪৮ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান প্রকল্পের বিশালতা এবং রাজ্য সরকারের (Government of West Bengal) প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে।
মন্ত্রী আরও জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আর্থিক সহায়তা মহিলাদের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক উদ্যোগে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বার্ধক্য ভাতার সঙ্গে সংযোগ
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর সঙ্গে বার্ধক্য ভাতা প্রকল্পের সংযোগ। মন্ত্রী শশী পাঁজা বিধানসভায় জানান, যে সকল মহিলার বয়স ৬০ বছর পার হয়, তাঁদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে ‘বার্ধক্য ভাতা’ প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনও আলাদা আবেদনের প্রয়োজন হয় না, যা সুবিধাভোগীদের জন্য প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ করে। এখন পর্যন্ত ৬ লক্ষ ৪ হাজার ৮৩৭ জন মহিলা এই প্রকল্পের মাধ্যমে বার্ধক্য ভাতা পেয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকল্প চালুর সময়ই ঘোষণা করেছিলেন যে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাধ্যমে মহিলারা তাঁদের যৌবনকালে আর্থিক ভাতা পাবেন, এবং ৬০ বছর বয়সে পৌঁছালে তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্ধক্য ভাতার আওতায় চলে যাবেন। এই নীতি রাজ্যের মহিলাদের জন্য একটি সুসংগঠিত ও নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের জনপ্রিয়তা ও অন্যান্য রাজ্যে প্রভাব
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির মধ্যে একটি। এর সাফল্য এতটাই উল্লেখযোগ্য যে, অন্যান্য রাজ্য, এমনকী বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোও এই মডেল অনুসরণ করে মহিলাদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা প্রকল্প চালু করেছে। তবে, মন্ত্রী শশী পাঁজা জানান, অন্যান্য রাজ্যে এই ধরনের প্রকল্পে প্রায়ই বিভিন্ন জটিল শর্ত আরোপ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ক্ষেত্রে এমন কোনও শর্ত নেই, যা এই প্রকল্পকে আরও সহজলভ্য এবং সর্বজনীন করে তুলেছে। যে কোনও মহিলা প্রয়োজনের ভিত্তিতে এই সুবিধা পেতে পারেন।
বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী বলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সাফল্যই এর প্রমাণ যে এটি মহিলাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। অন্যান্য রাজ্যে এই প্রকল্পের মডেল অনুসরণ করা হলেও, পশ্চিমবঙ্গের মতো এতটা সরল ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন কমই দেখা যায়।
আরও পড়ুন, রেশন কার্ডে ফ্রি রেশন পেতে হলে এই কাজ তাড়াতাড়ি করুন। শেষ তারিখ 25 জুন।
লক্ষ্মীর ভান্ডারের ভাতা বাড়ছে : সম্ভাবনা
গত মার্চ মাস থেকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে, শুক্রবারের বিধানসভায় এ বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসবে কিনা, তা নিয়েও কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে, এই প্রকল্পের জনপ্রিয়তা এবং এর সাফল্য বিবেচনায় রাজ্য সরকার ভবিষ্যতে ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
আরও পড়ুন, এই ভুল করলেই ফাঁকা হয়ে যাবে ব্যাংক একাউন্ট। গ্রাহকদের সতর্ক করলো রিজার্ভ ব্যাংক
উপসংহার
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মহিলা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন, এবং বার্ধক্য ভাতার সঙ্গে এর সংযোগ বয়স্ক মহিলাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করছে। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, অন্যান্য রাজ্যের জন্যও একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে।