পশ্চিমবঙ্গের আয় রোজগার বাড়াতে বাংলায় ফের ফিরছে সরকারি লটারি (Lottery)! যার নাম বঙ্গলক্ষী লটারি (Bongolokkhi Lottery) একটি রাজ্যের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে মজবুত রাখতে এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পর্যাপ্ত রাজস্বের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজ্য প্রশাসন উপার্জনের বিকল্প ও বৈধ উৎসগুলির সন্ধান করতে শুরু করেছে বেশ কিছুদিন যাবৎ।
Lottery: পশ্চিমবঙ্গে ফিরছে রাজ্য লটারি
রাজ্যের সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লটারি’ (Lottery) পুনরায় বাজারে ফিরিয়ে আনার জোরালো প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ২২শে জুন বিধানসভায় নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বাজেট পেশের পর পরই এই বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের সার্বিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে অর্থ দপ্তরকে এই বিষয়ে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকারি স্তরে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের মানুষ আবারও সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষায় নিজেদের ভাগ্যপরীক্ষা করার সুযোগ হাতে পাবেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজার থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ অর্থ সরাসরি সরকারি খাতের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে পুনর্ব্যহূত করা সম্ভব হবে। প্রশাসনের শীর্ষমহলের এই সবুজ সংকেত মেলায় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির অন্দরে আইনি ও পরিকাঠামো গত প্রস্তুতি জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে।
এতদিন বন্ধ ছিলো কেন
ইতিহাসের পাতা ও বিগত বছরগুলির খতিয়ান ঘাটলে দেখা যায় যে একসময় এই রাজ্য লটারি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। তবে হঠাৎ করেই এক রহস্যজনক কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে সরকারি এই লটারির সমস্ত খেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এই লাভজনক ব্র্যান্ডটিকে বেসরকারি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিয়ে রাজস্ব আদায়ের একটি বিকল্প চেষ্টা করেছিল তৎকালীন শীর্ষ প্রশাসন। সেই উদ্দেশ্যে সরকারি স্তরে বিশ্বব্যাপী দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করা হলেও কোনো নামী বেসরকারি সংস্থা তাতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। ফলে সঠিক পরিচালন ব্যবস্থার অভাব এবং উপযুক্ত অংশীদারের অনুপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব ব্র্যান্ডের টিকিট পুরোপুরি বাজার থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে রাজ্য সরকার কেবল বিপুল পরিমাণ নিশ্চিত আয় থেকেই বঞ্চিত হয়নি, বরং সাধারণ মানুষের আগ্রহও হারিয়েছিল।
নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত
ক্ষমতায় আসার পরপরই নতুন ডাবল ইঞ্জিন সরকার রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত পুনর্নির্মাণে বেশ কিছু কঠোর অথচ যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর যুক্তি হলো, বর্তমানে বাইরের বিভিন্ন রাজ্যের বেসরকারি লটারি সংস্থাগুলি নামমাত্র আইনি অনুমতি নিয়ে বাংলায় রমরমিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। এর ফলে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত উপার্জনের সিংহভাগ অর্থ অন্য রাজ্যের কোষাগারে এবং বেসরকারি মালিকদের পকেটে চলে যাচ্ছে।
এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি রুখতে মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন যে ভিনরাজ্যের সংস্থাকে ফায়দা না দিয়ে রাজ্য নিজেই কেন এই ব্যবসা পরিচালনা করবে না। তবে এবার জালিয়াতি রুখতে যে সমস্ত টিকিট অবিক্রীত থেকে যাবে, সেগুলিকে কোনোভাবেই ড্রয়ের অন্তর্ভুক্ত না করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত এবং अत्याधुनिक প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পুরো খেলাটি পরিচালিত করার ব্লু-প্রিন্ট ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে সরকার।
রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি
বিগত বছরগুলির আর্থিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই খাত থেকে রাজ্যের কোষাগারে কত বড় অঙ্কের নিট মুনাফা আসত। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার বার্ষিক মোট ৪৮টি साप्ताहिक খেলা এবং ৬টি স্পেশাল বাম্পার লটারির সফল আয়োজন করত। সেই সময়ে মাত্র ২ টাকা ও ৫ টাকা মূল্যের টিকিট বিক্রি করে প্রতি বছর প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লক্ষ টাকার নিট রাজস্ব সরকারি তহবিলে জমা পড়ত। এরপর ২০১৮ সালের মে মাস থেকে প্রতিদিন খেলা শুরু হওয়ার পর মাত্র এক বছরেই টিকিট বিক্রির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। যার ফলে ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে যথাক্রমে ২২৩ কোটি ও ৩০০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব অর্জিত হয়েছিল সরকারের। বর্তমান সরকার আশা করছে, এবার আরও সুসংহত উপায়ে এই প্রকল্প চালু করলে বার্ষিক আয় পূর্বের সমস্ত রেকর্ডকে অনায়াসে ছাপিয়ে যাবে।
লটারি প্রেমিদের সুখবর
সরকারি স্তরে এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যের সাধারণ ক্রেতা ও লটারিপ্রেমীদের মহলে ব্যাপক উদ্দীপনা ও আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গলক্ষ্মী সুপার কিংবা বঙ্গভূমি সুপারের মতো জনপ্রিয় সাপ্তাহিক টিকিটগুলি আবার সস্তায় কিনতে পারার সুযোগ সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালে আসবে। একই সাথে দুর্গাপূজা, দীপাবলি কিংবা রথযাত্রার মতো বড় উৎসবগুলিতে কোটি টাকার আকর্ষণীয় বাম্পার পুরস্কারের রোমাঞ্চ ফিরে পেতে চলেছেন নাগরিকরা।
সরকারি নিয়মের অধীনে খেলা পরিচালিত হওয়ায় টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়ার বা আর্থিক জালিয়াতির কোনো আশঙ্কা থাকবে না ক্রেতাদের মনে। শুধু তাই নয়, এই লটারি চক্রকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে লক্ষাধিক বেকার যুবকের নতুন করে রুটি-রুজির সংস্থান ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। স্বভাবতই, দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর প্রিয় ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের টিকিট কাটার সুযোগ পাওয়ার আনন্দে সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লটারির এই পুনরুজ্জীবন রাজ্যের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে একটি নতুন জোয়ার নিয়ে আসবে। শুধুমাত্র কর চাপিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট খালি না করে, এই ধরনের বাণিজ্যিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়া যে কোনো আধুনিক সরকারের বাস্তবসম্মত লক্ষণ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন কালোবাজারি ও ভিনরাজ্যের লটারি মাফিয়াদের একচেটিয়া দাপট সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে কোষাগারের ঘাটতিও মিটবে।