পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজীবী মানুষের জন্য রাজ্য সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্পটি (Krishak Bandhu Scheme) বরাবরই অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে সম্প্রতি ২০২৬-২৭ সালের রাজ্য বাজেটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এই প্রকল্পের পরিধি বাড়িয়ে ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকদের জন্যও এক বড় ঘোষণা করেছেন। এখন থেকে যাঁদের নিজস্ব চাষযোগ্য জমি নেই, তাঁরাও সরকারি আর্থিক সাহায্যের আওতায় আসবেন। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে জমি না থাকলেও কৃষি শ্রমিকরা বছরে ৪,০০০ টাকা পেতে পারেন।
Krishak Bandhu – ভূমিহীন কৃষকদের ও কৃষক বন্ধু
রাজ্যের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কিন্তু একটা বড় অংশের মানুষের নিজস্ব কোনো কৃষিজমি (Krishak Bandhu Scheme for Landless Farmers) নেই। তাঁরা অন্যের জমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ফসল ফলান। এতদিন পর্যন্ত কৃষকবন্ধু প্রকল্পের সুবিধা মূলত জমির মালিক বা নথিভুক্ত ভাগচাষিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু নতুন এই ঘোষণায় ওই ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের মুখেও হাসি ফুটেছে। রাজ্য সরকার তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি দিতেই এই বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেছে।
কৃষক বন্ধু প্রকল্পের নতুন নিয়ম ও আর্থিক সহায়তা
নতুন এই নিয়মে বলা হয়েছে, ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকরা বছরে মোট ৪,০০০ টাকা পাবেন। এই টাকা সরাসরি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তবে এই টাকা একবারে পাওয়া যাবে না, বরং দুটি কিস্তিতে আসবে। খরিফ মরসুমে ২,০০০ টাকা এবং রবি মরসুমে আরও ২,০০০ টাকা উপভোক্তারা পাবেন। এর ফলে চাষের মরসুমে সাধারণ শ্রমিকদের হাতে কিছু বাড়তি নগদ অর্থ থাকবে। সরকারের লক্ষ্য হলো গ্রামীণ এলাকার প্রান্তিক মানুষের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।
আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা
কৃষকবন্ধু (Krishak Bandhu Scheme) প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। তাঁর নামে কোনো কৃষিজমি থাকা চলবে না এবং তিনি অন্য কোনো জমি-সংক্রান্ত সরকারি সাহায্য (যেমন কৃষক বন্ধু নতুন) পাচ্ছেন না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া আবেদনকারীকে মূলত অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। যাঁরা ভাগচাষি হিসেবে নথিভুক্ত নন, কিন্তু প্রকৃত অর্থেই ক্ষেতমজুর, তাঁরাই আবেদনের যোগ্য। সরকারি এই উদ্যোগটি মূলত গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের কথা মাথায় রেখে নেওয়া হয়েছে।
নথিপত্র এবং আবেদন প্রক্রিয়া
আবেদন করার জন্য আবেদনকারীর (Farmers) আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া একটি সচল সাধারণ সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। মনে রাখবেন, জনধন অ্যাকাউন্ট বা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট এই প্রকল্পের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। আবেদনের সময় ব্যাঙ্কের পাসবুকের প্রথম পাতার ছবি এবং পাসপোর্ট সাইজ ছবি জমা দিতে হবে। এছাড়া একটি স্ব-ঘোষণাপত্র দিতে হবে যেখানে উল্লেখ থাকবে যে আবেদনকারী একজন ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক। বর্তমানে ব্লক স্তরে আয়োজিত বিশেষ শিবিরের মাধ্যমে এই আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।
কৃষক বন্ধু পেলেও যুব সাথীর টাকা পাবেন, এখানে নিয়ম গুলো দেখুন।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা
রাজ্য সরকার এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করছে। আবেদনের পর সংশ্লিষ্ট ব্লকের সহকারী কৃষি অধিকর্তা সমস্ত নথিপত্র যাচাই করবেন। এরপর তথ্যগুলো একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করা হবে। এনপিসিআই (NPCI) মারফত ব্যাঙ্কের তথ্য যাচাই করার পরই টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। ডিবিটি (Krishak Bandhu Scheme Direct Benefit Transfer) পদ্ধতিতে টাকা পাঠানো হবে বলে মাঝপথে কোনো টাকা কাটার ভয় থাকবে না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ টাকাটি সরাসরি উপভোক্তার হাতে পৌঁছাবে।
প্রকল্পের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই মানবিক পদক্ষেপ লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ পরিবারকে স্বস্তি দেবে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই ৪,০০০ টাকা ভূমিহীন শ্রমিকদের জন্য অনেক বড় পাওনা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা যুব সাথী প্রকল্পের মতো এটিও একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। সরকারের এই নীতি প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে এবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনেও এই জনমুখী প্রকল্পের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিশেষে বলা যায়, কৃষক বন্ধু প্রকল্পের (Krishak Bandhu Scheme) এই সম্প্রসারণ রাজ্যের কৃষি ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করছে। জমি থাকুক বা না থাকুক, মেহনতি মানুষের পাশে থাকার এই বার্তা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে। আপনি যদি একজন ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক হন, তবে দেরি না করে নিকটবর্তী ক্যাম্পে যোগাযোগ করে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন। সঠিক সময়ে আবেদন করলে আপনিও এপ্রিল মাস থেকেই এই প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এই ধরনের জনকল্যাণমূলক খবর পেতে আমাদের নিয়মিত অনুসরণ করুন।