অবশেষে প্রায় ৪৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষায় পাশ ফেল (Pass Fail System) ফেরার ইঙ্গিত মিলল। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে পাশ-ফেল প্রথা ফেরানোর দাবি উঠছিল। এবার সেই দাবিতে সরাসরি সহমত পোষণ করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে স্কুলে পাশ-ফেল ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। শুধু তাই নয়, বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মোবাইল আসক্তি কমাতেও (Mobile Addiction) সরকারকে ভাবার সময় এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী কি কি জানালেন, এবং আগামী শিক্ষাবর্ষে কি কি হতে পারে, জেনে নিন।
Pass Fail System – স্কুল শিক্ষায় ফিরছে পাশ ফেল
বর্তমানে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি স্কুলে কোনও পাশ-ফেল নেই। তবে রাজ্য সিলেবাস কমিটি পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এই নিয়ম ফেরাতে আগ্রহী। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবারে পাশ না করতে পারলে পড়ুয়াদের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে। তাদের জন্য অতিরিক্ত ১৫ দিন থেকে এক মাসের রেমিডিয়াল ক্লাস চলবে। এরপর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং তাতে অকৃতকার্য হলে একই ক্লাসে রাখা হবে।
পাশ-ফেল প্রথার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক
১৯৮২ সালে বাম জমানায় প্রাথমিকে প্রথম পাশ-ফেল প্রথা (Pass Fail System) তুলে দেওয়া হয়। এবং ১৯৮৪ সালে প্রাথমিক স্তরে ইংরাজিও তুলে দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালে রাজ্যে বিরাট গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ইংরাজি শুরু করলেও পাস ফেল ফেরেনি। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষার অধিকার আইনের মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা ব্যবস্থা শিথিল করা হয়। তবে পাস ফেল না থাকায় পরীক্ষার গুরুত্ব বরাবরই কমেছে প্রান্তিক সমাজের মানুষের কাছে। আর স্কুলে অনিয়মতা ও স্কুলছুট ও বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এই প্রথা ফেরানোর পক্ষে কথা বলায় শিক্ষামহলে স্বস্তি ফিরেছে।
স্কুল পড়ুয়াদের মোবাইল আসক্তি কমাতে উদ্যোগ
আজকাল বাচ্চাদের হাতে সারাদিন ফোন আর ফোন। মাঠে খেলার পরিবর্তে মোবাইল গেমস আর রিলস দেখতে তারা বেশি আগ্রহী। তাই স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি কমাতে রাজ্য সরকার কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগের জমানায় একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ফোন কেনার জন্য সরাসরি টাকা দেওয়া হতো। এবার সেই নিয়ম পুরোপুরি বদলে ফেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্মার্টফোনের অপব্যবহার রুখতে পড়ুয়াদের সরাসরি শিক্ষামূলক ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন, সরকারের জোড়া স্কলারশিপ। স্কুলে পড়লে ১২০০০ ও কলেজে পড়লে ২০০০০ টাকা পাবেন।
সংস্কৃতি ও পাঠ্যক্রমের আধুনিকীকরণ
স্কুল ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের মোবাইল সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিতর্ক, কুইজ এবং উপস্থিত বক্তৃতার মতো নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশ এসেছে। এমনকি তবলা, হারমোনিয়াম ও গিটারের মতো বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণও পাঠ্যক্রমের আওতায় আসবে। এর ফলে পড়ুয়ারা ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারবে।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা
পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এই বড় বার্তা দেন। তিনি জানান, শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বে এখন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। তাঁরা সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে রাজ্য সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেবেন। মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন যে পাশ-ফেল ফিরলে পড়ুয়াদের পড়াশোনায় আগ্রহ ও একাগ্রতা বাড়বে। পাশাপাশি দেশের সঠিক ও আধুনিক ইতিহাস সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
কবে চালু হতে পারে
শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই পরিবর্তনগুলি রাতারাতি কার্যকর করা হবে না। কারণ এতে আইনি জটিলতা রয়েছে। প্রথমে সংশোধনী বিল পাশ করতে হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম চালু করার প্রস্তুতি চলছে। রাজ্য সিলেবাস কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন মিললেই প্রাথমিকে না হলেও অন্তত পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মূল্যায়ন শুরু হবে। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই পড়ুয়ারা এই নতুন নিয়মের আওতায় আসবে।
উপসংহার
রাজ্যের স্কুল শিক্ষায় পাশ-ফেল প্রথা (Pass Fail System in West Bengal) ফিরে এলে পড়াশোনার মান অনেকটাই বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। পড়ুয়াদেরও পড়াশোনার তাগিদ থাকবে। এদিকে মোবাইল দেওয়ার বদলে শিক্ষামূলক ট্যাব দেওয়ার সিদ্ধান্তটিও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন সরকারের চূড়ান্ত নির্দেশিকা ও শিক্ষাবর্ষ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে গোটা শিক্ষামহল।