প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, বাংলা আবাস যোজনা বা বাংলার বাড়ি প্রকল্পের মতো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিজ গৃহ নিজ ভূমি তথা Nijo Griha Nijo Bhumi Scheme আরেকটি জনকল্যানমূলক প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমেও নিজের বাড়ি করার সুযোগ দিচ্ছে রাজ্য সরকার। নিজ গৃহ নিজ ভুমি প্রকল্প কাদের জন্য, PM Awas Yojana বা Banglar Bari Scheme এর সাথে এই প্রকল্পের পার্থক্য কি, এই প্রকল্পের সুবিধা কবে থেকে পাবেন, কিভাবে পাওয়া যাবে, এখন ফর্ম ফিলাম চলছে কিনা, নিজ গৃহ নিজ ভূমি প্রকল্পে কিভাবে আবেদন করা যায়, বিস্তারিত জেনে নিন।
Nijo Griha Nijo Bhumi Scheme
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে গ্রামীণ এলাকার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে ২০১১ সালে শুরু হয়েছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার নাম ‘নিজ গৃহ নিজ ভূমি’ প্রকল্প। এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যের প্রান্তিক স্তরের মানুষদের একটি স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া। এর মাধ্যমে শুধু এক টুকরো জমি নয়, বরং আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলাই এর নেপথ্যে থাকা প্রধান উদ্দেশ্য।
পশ্চিমবঙ্গ নিজ গৃহ নিজ ভূমি প্রকল্পের বিবরণ
গ্রামীণ বাংলার কৃষি শ্রমিক, মৎস্যজীবী এবং গ্রাম্য কারিগরদের অধিকাংশেরই নিজেদের নামে জমি ছিল না। এই অসহায়তার কথা মাথায় রেখেই গত ১৮ অক্টোবর, ২০১১ সালে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর এই প্রকল্পটির শুভ সূচনা করে। এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে প্রতিটি পরিবারের একটি নিজস্ব ঠিকানা থাকবে। এই সরকারি উদ্যোগের ফলে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষের দীর্ঘদিনের পাকা বাড়ির স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীনদের সরকারি খাস জমি বা প্রয়োজনে জমি কিনে বন্টন করা হয়। অনেকদিন ধরে এই প্রকল্প বন্ধ ছিলো। এবার আবার নতুন করে বাংলার বাড়ি (PM Awas Yojana Banglar Bari Scheme) প্রকল্পের সাথে এটি যুক্ত করা হতে পারে। যাতে উপকৃত হতে পারেন, আরও প্রচুর মানুষ।
কারা এই প্রকল্পের অধীনে জমি পাওয়ার যোগ্য?
Nijo Griha Nijo Bhumi প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। মূলত ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক, গ্রামীণ কারিগর এবং মৎস্যজীবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এই বিশেষ সরকারি পরিষেবায়। আবেদনকারী বা তার পরিবারের নামে রাজ্যের অন্য কোথাও কোনো নিজস্ব জমি বা পাকা বাড়ি থাকা চলবে না। এছাড়াও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রান্তিক সদস্যরাও এই প্রকল্পের অধীনে জমির জন্য আবেদন করার সুযোগ পান। মূলত যারা চরম দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন, তাদের জন্যই এই সুযোগটি বরাদ্দ থাকে।
এই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত জমির পরিমাণ ও বন্টন প্রক্রিয়া
নিজ গৃহ নিজ ভূমি প্রকল্পের (Nijo Griha Nijo Bhumi Scheme) অধীনে প্রতিটি যোগ্য পরিবারকে সর্বোচ্চ ৫ ডেসিমেল বা ৫ শতক জমি দেওয়া হয়। এই জমি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত এই জমির পাট্টা বা মালিকানা স্বত্ব পরিবারের মহিলার নামে অথবা স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ নামে দেওয়া হয়। এর ফলে পরিবারের নারীশক্তির ক্ষমতায়ন ঘটে এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। জমি বন্টনের সময় সরকারের পক্ষ থেকে মালিকানার দলিল ও দখল নিশ্চিত করা হয়।
Nijo Griha Nijo Bhumi আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা
রাজ্য সরকার কেবল জমি দিয়েই নিজের দায়বদ্ধতা শেষ করে না, বরং সেখানে ঘর তৈরির ব্যবস্থাও করে। বিভিন্ন সরকারি আবাসন প্রকল্পের (যেমন- গীতাঞ্জলি বা আমার ঠিকানা) সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে এই জমিতে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়। শুধু ঘর নয়, সেখানে যাতায়াতের জন্য রাস্তা, পানীয় জলের সুব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের সুবিধাও থাকে। এছাড়া স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে সরকারের তরফ থেকে শৌচাগার ও উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থা তৈরি করে দেওয়া হয়। সরকারের এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সুবিধাভোগীদের জীবনযাত্রার মানকে অনেকটাই উন্নত করে তোলে।
কর্মসংস্থান ও জীবন-জীবিকার সুযোগ
এই ৫ ডেসিমেল জমিকে কেন্দ্র করে উপভোক্তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়। বাড়ির পাশের অবশিষ্ট জমিতে সবজি চাষ, ফলমূলের বাগান বা পশুপালনের মাধ্যমে উপার্জনের পথ প্রশস্ত হয়। কারিগর বা হস্তশিল্পীদের জন্য কাজের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা ওয়ার্কশপ তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে এই প্রকল্পে। এছাড়াও প্রয়োজনবোধে বাড়ির কাছে পুকুর খনন করে মাছ চাষের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এভাবে একটি জমিকে কেন্দ্র করে দরিদ্র পরিবারগুলো স্থায়ী অর্থনৈতিক সচ্ছলতার মুখ দেখতে পায়।
নিজ গৃহ নিজ ভূমি প্রকল্পে আবেদন পদ্ধতি
নিজ গৃহ নিজ ভূমি প্রকল্পে আবেদনের জন্য ইচ্ছুক ব্যক্তিকে স্থানীয় ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরে (BLRO Office) যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে নির্দিষ্ট আবেদনপত্রের মাধ্যমে নিজের এবং পরিবারের তথ্য জানিয়ে জমির জন্য দাবি জানাতে হয়। আবেদনের সাথে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র, আধার কার্ড এবং ভূমিহীন হওয়ার প্রমাণস্বরূপ প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে হবে। বিএলআরও অফিস থেকে আধিকারিকরা সরেজমিনে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করার পরেই অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। সঠিক তথ্য প্রদান করলে অতি দ্রুত জমি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
এই প্রকল্পের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
গত কয়েক বছরে এই প্রকল্পের সফল রূপায়ণের ফলে গ্রামীণ বাংলার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। মানুষ এখন ভাড়া বাড়িতে বা যাযাবরের মতো না থেকে নিজেদের জমিতে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারছে। জমির মালিকানা পাওয়ায় তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যা তাদের কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টির মান এবং সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে এই প্রকল্প অসামান্য অবদান রাখছে। এক কথায়, নিজ গৃহ নিজ ভূমি প্রকল্প বাংলার দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এক অনন্য চাবিকাঠি।
