বকেয়া ডিএ ধর্মঘটের মাশুল: এপ্রিল মাসে বেতন ছাঁটাইয়ের মুখে বাংলার সরকারি কর্মীরা
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের জন্য বসন্তের শেষে বেতন কাটা নিয়ে (Salary Deduction) এক অস্বস্তিকর সংবাদ বয়ে আনল নবান্ন। বকেয়া মহার্ঘ ভাতার (Dearness Allowance) দাবিতে গত ১৩ই মার্চ যে রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতি বা ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তার প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে চলেছে কর্মীদের পকেটে। রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই বিশেষ দিনে যারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, এপ্রিল মাসের বেতন থেকে তাদের একদিনের পারিশ্রমিক কেটে নেওয়া হতে পারে। নবান্নের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে যা প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সাধারণ সরকারি কর্মীদের মধ্যে এই বেতন কাটার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এক প্রকার হতাশা এবং দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। যদিও আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো তাদের দাবিতে এখনও অনড় থাকার বার্তা দিচ্ছে।
কেন বেতন কাটার সিদ্ধান্ত নিল নবান্ন?
মূলত বকেয়া ডিএ-র দাবিতে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ সহ একাধিক সংগঠন গত ১৩ই মার্চ পূর্ণ দিবস ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধর্মঘট রুখতে আগেভাগেই একটি কড়া নির্দেশিকা বা মেমো জারি করা হয়েছিল। ওই নির্দেশিকায় স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, নির্দিষ্ট কোনো জরুরি কারণ ছাড়া ১৩ই মার্চ কোনোভাবেই ছুটি নেওয়া যাবে না। ক্যাজুয়াল লিভ বা অন্য কোনো অগ্রিম ছুটি ওই দিনের জন্য বাতিল ঘোষণা করেছিল অর্থ দপ্তর। নবান্ন চেয়েছিল সরকারি পরিষেবা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয় এবং কর্মীরা যেন হাজিরা দেন। কিন্তু প্রশাসনের সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই বহু কর্মী ধর্মঘটে শামিল হয়েছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।
‘ডাইস-নন’ ও চাকরির মেয়াদে প্রভাব
সরকারি পরিভাষায় ওই দিনের অনুপস্থিতিকে ‘ডাইস-নন’ (Dies-non) হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। ডাইস-নন হওয়ার অর্থ হলো, ওই দিনটি কর্মীর চাকরি জীবনের মেয়াদের মধ্যে গণনা করা হবে না। এর ফলে শুধু যে একদিনের বেতন কাটা যাবে তাই নয়, ভবিষ্যতে পেনশন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও এটি একটি ‘ব্রেক ইন সার্ভিস’ হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকবে। প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী ৩০শে মার্চের মধ্যে হাজিরা যাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে প্রতিটি দপ্তরকে। যেহেতু মার্চ মাসের হিসাবের ভিত্তিতে এপ্রিলের বেতন তৈরি হয়, তাই এপ্রিলের শুরুতেই কর্মীদের হাতে কম টাকা আসার সম্ভাবনা প্রবল। অনেক কর্মীই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
শোকজ ও বিভাগীয় পদক্ষেপের সতর্কতা
বেতন কাটার পাশাপাশি আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশাসন এখন ‘শোকজ’ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানোর তোড়জোড় করছে। যে সমস্ত কর্মী সেদিন অফিসে আসেননি, তাদের কাছে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এবং উপযুক্ত প্রমাণপত্র তলব করা হচ্ছে। যদি কোনো কর্মীর দেওয়া কারণ সন্তোষজনক না হয়, তবে কেবল বেতন কাটায় বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় স্তরে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে নবান্ন। নিয়ম অনুযায়ী, অসুস্থতা বা বাড়ির কোনো চরম বিপর্যয় ছাড়া অন্য কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না। এই কড়াকড়ি দেখে অনেক অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, সরকার এবার আন্দোলনের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিতে চাইছে।
ডিএ আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মীরা। সুপ্রিম কোর্টে এই মামলা চললেও রাজ্য সরকার আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বারবার তুলে ধরেছে। সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের নেতা ভাস্কর ঘোষ সাফ জানিয়েছেন যে, বেতন কেটে বা ভয় দেখিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই পরিস্থিতিতে কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, ন্যাজ্য দাবির লড়াইয়ে কোনো কর্মীর ওপর অন্যায় হলে তিনি তা মুখ বুজে সহ্য করবেন না। সব মিলিয়ে ডিএ ইস্যু এখন কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং বড়সড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের আকার নিয়েছে।
আরও পড়ুন, পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, দেখুন
উপসংহার: এপ্রিলের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা
সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসের শুরুতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্যালারি ক্রেডিট হওয়ার এসএমএস নিয়ে চিন্তায় আছেন কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারী। নবান্নের এই কঠোর অবস্থান কি ভবিষ্যতে আন্দোলনকে আরও তীব্র করবে নাকি কর্মীদের পিছু হঠতে বাধ্য করবে, তা সময় বলবে। তবে আপাতত বেতন কাটার খাঁড়া যে মাথার ওপর ঝুলছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সরকারি দপ্তরের অন্দরমহলে এখন একটাই আলোচনা—কারা কারা রেহাই পাবেন আর কাদের বেতন কাটা যাবে। আগামী কয়েক দিনে হাজিরা সংক্রান্ত স্ক্রুটিনি শেষ হলেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে ডিএ আন্দোলন এবং সরকারের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।