পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমের গ্রাহকদের লাখ লাখ টাকা নিয়ে চম্পট দিলো ডাক পিওন। পাকড়াও পোস্ট মাস্টার। গ্রাহকের টাকার কি হবে?

এই মিউচুয়াল ফান্ড, শেয়ার মার্কেট, স্টক মার্কেটে বিনিয়োগের সময় ও আজও প্রচুর মানুষ পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমে বিনিয়োগ (Post Office Schemes) করেন। আর পোস্ট অফিস সহ বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের অন্যতম কারণ হলো সুদের হার কম হলেও টাকা মার না যাওয়ার নিরাপত্তা রয়েছে। তবে আজকাল কিছু অসাধু চক্রের দরুন পোস্ট অফিস, সরকারি ব্যাংক বা ভারতীয় জীবন বীমা নিগম বা LIC এর টাকা ও মার যাচ্ছে অনেক গ্রাহকদের। আর এমনি ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের পোস্ট অফিসে। যেখানে পোস্ট অফিসের কর্মচারী ই টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছে। বিস্তারিত জেনে নিন।

পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

মেদিনীপুরের ডেবরা ব্লকের জালিমন্দা গ্রাম পঞ্চায়েতের সাঁইতল এলাকায় পোস্ট অফিসে জমা দেওয়া গ্রামবাসীদের টাকা আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়মিত পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমে টাকা জমা করতেন, কিন্তু সেই টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি। অভিযুক্ত পিওন অমল দোলই, যিনি শিবু নামেও পরিচিত, কয়েক লক্ষ টাকা নিয়ে পালিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ঘটনায় গ্রামে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এবং বাসিন্দারা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। সোমবার গ্রামবাসীরা পোস্ট অফিসে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। ঘটনার তদন্তে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।

পোস্টমাস্টার আটক

গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন স্থানীয় পোস্টমাস্টার, যাঁকে অফিসে আটকে রেখে বিক্ষোভ দেখানো হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পোস্টমাস্টার নিয়মিত অফিসে আসতেন না, এবং পিওনই সমস্ত কাজ পরিচালনা করত। বিক্ষোভের খবর পেয়ে ডেবরা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চলতে থাকে। অভিযোগ, পিওন শিবু গ্রামবাসীদের বিশ্বাস অর্জন করে তাঁদের টাকা জমা নিত, কিন্তু সেই পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা না করে আত্মসাৎ করেছে। এই ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

টাকা লুটের ঘটনা: কীভাবে প্রকাশ্যে এল?

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি একজন গ্রামবাসী তাঁর পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমের পাসবুক আপডেট করতে মাদপুরের মূল শাখায় যান। সেখানে তিনি জানতে পারেন যে তাঁর অ্যাকাউন্টে প্রত্যাশিত টাকার তুলনায় অনেক কম টাকা রয়েছে। এই ঘটনা তাঁর সন্দেহ জাগায়, এবং পরবর্তীতে অন্য গ্রাহকরাও তাঁদের অ্যাকাউন্ট যাচাই করে একই সমস্যা লক্ষ্য করেন। উদাহরণস্বরূপ, অলিদাদপুরের বাসিন্দা সমর মাইতি জানান, তিনি ২০০০ সাল থেকে পোস্ট অফিসে টাকা জমা করছেন। তিনি মোট ৯৩ হাজার টাকা জমা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর অ্যাকাউন্টে মাত্র ১৪ হাজার টাকা রয়েছে। এই ঘটনা গ্রামবাসীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন, পশ্চিমবঙ্গের ডিএ মামলা নিয়ে সুখবর। AICPI কেন্দ্রীয় হারে ডিএ মামলার মোড় ঘুরে গেল।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত পিওন শিবু অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করতেন, যার ফলে গ্রামবাসীরা তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা করতেন। তিনি গ্রামবাসীদের কাছ থেকে টাকা জমা নিয়ে পোস্ট অফিসের কাজ পরিচালনা করতেন। কিন্তু এই বিশ্বাসের অপব্যবহার করে তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। গ্রামবাসীরা জানান, পোস্টমাস্টারের অনুপস্থিতিতে পিওনই সমস্ত লেনদেনের দায়িত্বে ছিলেন। এমনকি শিবুর বাড়িতে গিয়েও গ্রামবাসীরা তাঁর কোনো হদিস পাননি। এই ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব পরিবারগুলো, চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

স্থানীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া

জেলা পরিষদের নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ শান্তি টুডু এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় তৃণমূল নেতা সুকুমার মাইতি বলেন, এই ঘটনায় গ্রামের মানুষ চরম সমস্যায় পড়েছেন। তিনি পিওনের গ্রেপ্তারি ও টাকা ফেরতের দাবি করেছেন। বাসিন্দা জয়দেব দাসও প্রশাসনের কাছে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের আবেদন জানিয়েছেন। পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং দোষীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন, শূন্য পুঁজিতে সেরা ব্যবসার আইডিয়া। সরকারি সাহায্য নিয়ে ব্যবসা করুন

পোস্ট অফিসের অব্যবস্থাপনা: গ্রামবাসীদের দুর্দশা

জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে সাঁইতলের এই পোস্ট অফিসে গ্রাহক সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন পোস্ট অফিস সঞ্চয় প্রকল্পের (Post Office Schemes) আওতায় গ্রামবাসীরা এখানে টাকা জমা করতেন। কিন্তু ২০২১ সালে নতুন পোস্টমাস্টার নিয়োগের পর থেকে সমস্যা শুরু হয়। পোস্টমাস্টারের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে পিওনই পোস্ট অফিসের সমস্ত কাজ পরিচালনা করতেন। এই অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে পিওন টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। গ্রামবাসীরা এখন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া পোস্ট অফিস সঞ্চয় স্কিমের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন।

শেয়ার করুন: Sharing is Caring!