পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের পার্শ্ব শিক্ষক, শিক্ষামিত্র, SSK MSK শিক্ষকদের স্থায়ী শিক্ষকদের মতো সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দিলো ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামিত্র, পার্শ্ব শিক্ষক, প্যারাটিচার (Para Teacher), বা শিক্ষা স্বেচ্ছাসেবক—নাম যাই হোক না কেন, তাঁরা এখন সাধারণ শিক্ষকদের মতো ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারবেন। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট সোমবার এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সাধারণ শিক্ষকদের মতো অন্যান্য সুযোগ সুবিধা (Employee Benefits) দেওয়ার নির্দেশ ও দিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে শীর্ষ আদালত পশ্চিমবঙ্গ সর্বশিক্ষা মিশনের আবেদন খারিজ করেছে। এই রায়ের ফলে রাজ্যের প্রায় ৩,৩৩৭ জন শিক্ষামিত্র সরাসরি উপকৃত হবেন। তাঁরা শিক্ষকদের মতোই সমস্ত সুবিধা পাবেন, যেমন বেতন, পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা মিত্রদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এছাড়া চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের সম কাজে সম বেতনের যে দাবি উঠেছে, তাঁর পক্ষেও একটা পোক্ত সমর্থন পাওয়া গেল।

পার্শ্ব শিক্ষক ও শিক্ষামিত্রদের ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ

২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সর্বশিক্ষা মিশনের আওতায় শিক্ষামিত্র নিয়োগ শুরু করে। এই কর্মীরা স্কুল পরিদর্শকের কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য স্কুলব্যাগ, জুতো এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ তাঁদের কাজের অংশ। এছাড়াও, স্কুলছুট শিশুদের শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে তাঁরা উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ২০১৩ সালে তাঁদের নাম পরিবর্তন করে ‘শিক্ষা স্বেচ্ছাসেবক’ করা হয়। এরপর ২০১৪ সাল থেকে অনেকের ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা আর্থিক সংকটের মুখে পড়েন।

কলকাতা হাইকোর্টের রায় ও সুপ্রিম কোর্টের সমর্থন

শিক্ষা মিত্রদের ভাতা বন্ধ হওয়ার পর তাঁরা কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। হাইকোর্ট তাঁদের পক্ষে রায় দিয়ে বলে, তাঁরা স্থায়ী শিক্ষকদের মতো ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরির সুবিধা পাবেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ সর্বশিক্ষা মিশন সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। কিন্তু বিচারপতি সঞ্জয় কুমার এবং সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চ রাজ্যের আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বলেন, “শিক্ষা মিত্র, শিক্ষা স্বেচ্ছাসেবক, পার্শ্বশিক্ষক—এসব নামের পেছনে লুকিয়ে তাঁদের শিক্ষক হিসেবে গুরুত্ব কমানো যাবে না।” এই রায় শিক্ষা মিত্রদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে একটি বড় জয় এনে দিয়েছে।

শিক্ষামিত্রদের জন্য এই রায়ের গুরুত্ব

এই রায় শিক্ষা মিত্রদের জন্য শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই নয়, তাঁদের পেশাগত মর্যাদাও বাড়িয়েছে। তাঁরা এখন স্থায়ী শিক্ষকদের সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন, যা তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে। পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা মিত্ররা প্রায় দুই দশক ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন। এই রায় তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও, এটি রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। স্কুলছুট শিশুদের শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করার কাজে তাঁদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে।

আরও পড়ুন, মাত্র ৪৫০ টাকায় পাবেন রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার। কেন্দ্র সরকারের বিরাট ঘোষণা। কিভাবে পাবেন জেনে নিন

পার্শ্ব শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধির দাবি

স্কুল সার্ভিস কমিশনের ২৬০০০ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল হওয়ার পর পার্শ্বশিক্ষকদের সর্বোচ্চ ৩৮০০০ টাকা বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতির খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিলো। তবে সেই খবর নিয়ে পরবর্তীতে সরকার পক্ষ থেকে তেমন কোনও তোড়জোড় দেখা যায়নি। গত ১৮ই মার্চ বিধান্সভার প্রশ্নোত্তর পর্বে, রাজ্যর শিক্ষামন্ত্রী জানান, “পার্শ্ব শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সমকাজে সমবেতন নীতি খাটে না। শিক্ষক ও পার্শ্বশিক্ষক পদ আলাদা, নিয়োগপদ্ধতি আলাদা। তাই সমকাজে সমবেতন এ ক্ষেত্রে হয় না।” তবে রাজ্য সরকার পার্শ্বশিক্ষকদের জন্য একাধিক জনহিতকর প্রকল্প রেখেছে, তার সুবিধাও প্যারা টিচাররা পান বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত বাম আমলে রাজ্যে পার্শ্বশিক্ষক বা প্যারা টিচার নিয়োগ শুরু হয়। এই নিয়োগ পদ্ধতি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির দ্বারা হতো। বিভিন্ন সরকারি ও সরকারি অনুদান প্রাপ্ত স্কুল, প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুল মিলিয়ে রাজ্যে প্রায় ৪৪ হাজার পার্শ্বশিক্ষক আছেন বলে সরকারি সূত্রে খবর। বর্তমানে প্রাথমিক স্কুলের প্যারা টিচাররা এখন প্রায় ১০ হাজার টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকের পার্শ্বশিক্ষকেরা প্রায় ১৩ হাজার টাকা বেতন পান। তবে সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ এবং ৩৮০০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির আশ্বাস কবে বাস্তবে রূপ নেবে সেই প্রতিক্ষায় রয়েছেন একই কাজ করেও এক চতুর্থাংশ বেতন পাওয়া শিক্ষকেরা।

আরও পড়ুন, দিনে মাত্র কয়েক ঘন্টা অনলাইনে পার্ট টাইমে কাজ প্রচুর টাকা আয় করুন।

ভবিষ্যৎ প্রভাব ও প্রত্যাশা

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ শিক্ষা মিত্রদের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, অন্যান্য রাজ্যের শিক্ষা মিত্রদের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। রাজ্য সরকারকে এখন এই রায় বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা মিত্রদের ভাতা পুনর্বহাল এবং অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। এই রায় শিক্ষাক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে এটি শিক্ষকদের সামগ্রিক কল্যাণে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

শেয়ার করুন: Sharing is Caring!