পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য সুখবর। এখন থেকে বিবাহিত কন্যারাও পাবেন গ্র্যাচুইটির অধিকার। সহজ ভাষায় বুঝে নিন

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মীদের পরিবারের জন্য এক ঐতিহাসিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত (Employee Benefits) গ্রহণ করল নবান্ন। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে এবার থেকে মৃত সরকারি কর্মীর বিবাহিত কন্যারাও ‘ডেথ গ্র্যাচুইটি’ বা মৃত্যুজনিত আর্থিক সুবিধা (Death Gratuity) পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সোমবার রাজ্য অর্থ দপ্তরের পেনশন শাখা থেকে এই মর্মে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক হাজার পরিবার যারা এতদিন আইনি প্যাঁচে পড়ে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তারা নতুন আশার আলো দেখছেন। মূলত লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য নবান্নের নতুন বিজ্ঞপ্তি

রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস সংবিধানের ৩০৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে এই নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছেন। এর ফলে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্ভিসেস (ডেথ-কাম-রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট) রুলস, ১৯৭১’-এর ৭ নম্বর ধারায় আমূল সংশোধন আনা হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সরকারি বিধিতে পরিবারের সংজ্ঞায় বিবাহিত কন্যাসন্তানদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে একাধিক প্রশ্ন উঠছিল। নবান্নের এই নতুন নির্দেশিকা জারির ফলে সেই দীর্ঘদিনের আইনি খামতি চিরতরে দূর হতে চলেছে। এখন থেকে বিবাহিত কন্যারাও পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্র্যাচুইটির টাকার ভাগ পাওয়ার আইনি দাবিদার হয়ে উঠলেন।

গ্রাচুইটি নিয়ে ‘পরিবার’ সংজ্ঞার বিস্তৃতি ও অন্তর্ভুক্তিকরণ

নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, গ্র্যাচুইটি পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘পরিবার’ শব্দটির পরিধি অনেকটা বাড়ানো হয়েছে যা আধুনিক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন। এখন থেকে পরিবারের তালিকায় কেবল স্ত্রী, পুত্র বা অবিবাহিত কন্যারা নন, যুক্ত হলেন বিবাহিত ও বিবাহবিচ্ছিন্না কন্যারাও। এছাড়াও মৃত কর্মীর সৎ ছেলে ও সৎ মেয়েদেরও এই সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে যা একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ। পরিবারের তালিকার নবম বিভাগে বিবাহিত কন্যাদের স্থান দিয়ে সরকার প্রমাণ করল যে বিবাহের পর মেয়েরা বাবার পরিবারের পর হয়ে যায় না। এই অন্তর্ভুক্তির ফলে গ্র্যাচুইটির টাকা বণ্টনের ক্ষেত্রে এক নতুন স্বচ্ছতা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।

অমীমাংসিত মামলা নিষ্পত্তিতে বড় সুবিধা

বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, যে সমস্ত গ্র্যাচুইটি সংক্রান্ত মামলা বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরে পড়ে আছে, সেগুলিও নতুন নিয়মেই সমাধান করা হবে। অর্থাৎ, বিজ্ঞপ্তি জারির আগে যদি কোনো সরকারি কর্মীর মৃত্যু হয়ে থাকে এবং সেই সূত্রে কোনো বিবাহিত বা বিবাহবিচ্ছিন্না কন্যার দাবি ঝুলে থাকে, তবে প্রশাসন তা বিবেচনা করবে। অনেক সময় আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে এই টাকা আটকে থাকত, যা এখন দ্রুত মিটে যাবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা এই অমীমাংসিত আবেদনগুলি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখে নিষ্পত্তি করে। এর ফলে অনেক অসহায় পরিবার যারা আর্থিক সংকটে ভুগছিলেন, তারা দ্রুত সুরাহা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন, বছরে ৪৫০০০ টাকা বেড়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরাট ঘোষণা।

নমিনেশন ও টাকা বণ্টনের বিশেষ নিয়ম

গ্র্যাচুইটি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সরকারি কর্মী যদি আগে থেকেই নির্দিষ্ট কাউকে ‘নমিনি’ বা উত্তরাধিকারী করে যান, তবে প্রথম অগ্রাধিকার তিনিই পাবেন। কর্মীরা চাইলে তাদের পরিবারের সদস্য ছাড়াও বাইরের কাউকে নমিনি করতে পারেন এবং টাকার শতকরা ভাগ নির্ধারণ করে দিতে পারেন। কিন্তু যদি কোনো কর্মীর বৈধ নমিনি না থাকে, তবেই এই নতুন সংশোধিত ‘পরিবার’ তালিকা অনুযায়ী টাকা ভাগ করা হবে। কর্মরত অবস্থায় কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আর কোনো ধোঁয়াশা থাকবে না বলেই মনে করছে প্রশাসন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীরা তাদের উত্তরসূরিদের জন্য এক নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা রেখে যেতে পারবেন।

সামাজিক সুরক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নে বড় পদক্ষেপ

নবান্নের এই সিদ্ধান্তকে কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে না দেখে একে সামাজিক সংস্কার হিসেবে দেখছেন সমাজতত্ত্ববিদরা। এতদিন মনে করা হতো বিয়ের পর মেয়েরা বাবার সম্পত্তির ওপর অধিকার হারায়, কিন্তু এই নতুন নিয়ম সেই প্রাচীন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাল। এই পরিবর্তনের ফলে বিবাহিত মেয়েরা বিপদের সময় বাবার রেখে যাওয়া সঞ্চয় থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য পাবেন যা তাদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোতে এই গ্র্যাচুইটির টাকা এক বিরাট অবলম্বন হয়ে দাঁড়াবে। রাজ্য সরকারের এই মানবিক মুখ আরও একবার স্পষ্ট হলো এই জনহিতকর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এনেছে।

শেয়ার করুন: Sharing is Caring!