পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি দপ্তরের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলো বাংলা শস্য বীমা (Bangla Shasya Bima) বা বিএসবি (BSB). এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সরাসরি আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের জুন মাস থেকে সারা রাজ্যের কৃষক বন্ধুদের (Krishak bandhu) পাশে দাঁড়াতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) উদ্যোগে এই প্রকল্প চালু হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখে রাজ্য সরকার সরাসরি কৃষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ক্ষতিপূরণের টাকা পাঠাতে শুরু করেছে। এবার কারা টাকা পাবেন, কত টাকা দেওয়া হবে, বিস্তারিত জেনে নিন।
Bangla Shashya Bima Kharif Fund Release
২০১৯ সালে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রচুর কৃষকের চাষবাসে বড়সড় আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তাদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী বাংলা শস্য বীমা প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর পর থেকে প্রতিবছরই কৃষকেরা বাংলা শস্য বীমার মাধ্যমে Crop Insurance এর টাকা নিজের ব্যাংক একাউন্টে সরাসরি পেয়ে থাকেন। আর এবার বছরের শুরুতেই সেই টাকা একাউন্টে ঢোকা শুরু হলো।
বাংলা শস্য বীমা ফরম ফিলাপ ও প্রকল্পের বিবরণ
বাংলা শস্য বীমা হলো মূলত একটি ফসল বিমা প্রকল্প যা পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার আদলে (PM Fasal Bima Yojana) হলেও, এ রাজ্যে কৃষকদের প্রিমিয়ামের সম্পূর্ণ টাকা রাজ্য সরকারই বহন করে। খরিফ ও রবি—উভয় মরসুমের বিভিন্ন ফসলের ওপর এই বিমার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষত ধান, পাট, ভুট্টা এবং আলুর মতো প্রধান অর্থকরী ফসলগুলো এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন বন্যা, খরা বা অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হলে কৃষকরা এর সুফল পান।
বাংলা শস্য বীমায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পদ্ধতি
রাজ্য সরকার স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করেছে। বাংলা শস্য বীমা ফরম ফিলাপ আবেদনকারী কৃষকদের নথিপত্র এবং জমির তথ্য যাচাই করার পর অনুমোদিত বিমা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে টাকা বরাদ্দ করা হয়। সম্প্রতি কয়েক লক্ষ কৃষকের অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে পাঠানো বা ডিবিটি (DBT) করা হয়েছে। কৃষকরা তাদের নিজস্ব ব্যাংক পাসবই আপডেট করে বা প্রকল্পের অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে পেমেন্টের স্ট্যাটাস চেক করতে পারেন। সঠিক সময়ে এই আর্থিক সাহায্য কৃষকদের পরবর্তী চাষের জন্য মূলধন জোগাতে বিশেষ সাহায্য করবে।
বাংলা শস্য বীমার সুবিধা কারা পাবেন?
পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা এবং পেশায় কৃষক এমন যে কোনো ব্যক্তি এই প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণের যোগ্য। এখানে জমির মালিক যেমন আবেদন করতে পারেন, তেমনই ভাগচাষি এবং ইজারাদারদের জন্য আবেদনের সুযোগ রয়েছে। আবেদনের জন্য মূলত ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, ব্যাংক পাসবই এবং জমির রেকর্ড বা পরচার প্রয়োজন হয়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও মূলত সকল স্তরের কৃষকরাই এই বিমার আওতায় আসতে পারেন। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
আরও পড়ুন, কৃষকদের ২০ হাজার টাকা দিচ্ছে, নতুন বছরের আবেদন শুরু হলো।
বাংলা শস্য বীমা স্ট্যাটাস চেক
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে বাংলা শস্য বিমার সমস্ত প্রক্রিয়া এখন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। কৃষকরা সরকারি পোর্টালে গিয়ে নিজেদের ভোটার আইডি কার্ড নম্বর দিয়ে আবেদনের স্থিতি বা বাংলা শস্য বীমা ভোটার কার্ড স্ট্যাটাস চেক করতে পারেন। এছাড়া যারা এখনো এই বিমায় নথিভুক্ত হননি, তারা নিকটবর্তী কৃষি অধিকর্তার অফিস বা সিএসসি সেন্টারের সাহায্য নিতে পারেন। বর্তমান সরকার এই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সহজলভ্য করার চেষ্টা করছে যাতে সাধারণ কৃষকরা দালালের খপ্পরে না পড়েন। নিজের স্মার্টফোনের মাধ্যমেই এখন ঘর বসেই সমস্ত তথ্য জানা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলা শস্য বীমা লিস্ট
কেবল আর্থিক সাহায্য নয়, কৃষকদের সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের পাশাপাশি বাংলা শস্য বিমা যোজনা কৃষি ক্ষেত্রে এক বিশাল সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে। ফসলের দাম না পাওয়া বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অনিশ্চয়তা থেকে কৃষকদের মুক্তি দিতে এই নিরলস প্রচেষ্টা চলছে। গ্রাম বাংলার কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং কৃষকের পারিবারিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে এই পদক্ষেপগুলি অত্যন্ত ইতিবাচক। আগামী দিনে এই প্রকল্পের আওতা আরও বাড়িয়ে রাজ্যের প্রতিটি কৃষককে সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলা শস্য বিমা প্রকল্পটি পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কোনো প্রকার প্রিমিয়ামের বোঝা ছাড়াই বিমার সুবিধা পাওয়া কৃষকদের কাছে বড় পাওনা হিসেবে গণ্য হয়। দুর্যোগের সময় সরকারি সাহায্য সময়মতো হাতে পাওয়ায় চাষিদের আত্মবিশ্বাস আগের চেয়ে অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তারা নতুন উদ্যমে চাষাবাদ করতে উৎসাহ পাচ্ছেন এবং কৃষিকাজে স্থায়িত্ব আসছে। সঠিক বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকলে এই প্রকল্প সারা দেশের মধ্যে একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।