পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ ১০ বছরের প্রতীক্ষিত বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (Dearness Allowance) বা ডিএ মামলা (DA Arrears) নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court of India) এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। গত ৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে শীর্ষ আদালত বকেয়া মহার্ঘ ভাতার ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে কড়া নির্দেশ প্রদান করেছে। বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কর্মীদের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে আর কোনো টালবাহানা সহ্য করা হবে না। আদালত শুধু রায়দান করেই ছেড়ে দেননি, বকেয়া টাকা কিভাবে মেটানো হবে, তারও নির্দিষ্ট নীতিমালা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন থেকে জেনে নিন:
- বকেয়া ডিএ দিতে সরকারের কত টাকা খরচ হতে পারে,
- গ্রুপ অনুযায়ী প্রত্যেক সরকারি কর্মী কত টাকা করে পেতে পারেন।
- কত দিনের মধ্যে এই টাকা পেতে পারেন?
- বাকি ৭৫% ডিএ কবে পাবেন?
- রাজ্য সরকার কি রায় মেনে নেবে, নাকি রিভিউ করবে?
DA Arrears: ২৫% DA দিলে কর্মীরা কত টাকা পাবেন?
সুপ্রিম কোর্ট তো বকেয়া ডিএ (DA Arrears) পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে রাজ্য সরকা ২৫% ডিএ এই সময়ের মধ্যে পরিশোধ করবে কিনা, বা কিভাবে পরিশোধ করবে, কি কি আইনি পদক্ষেপ রয়েছে, এই নিয়ে ইতিমধ্যেই আইনি পরামর্শ শুরু করেছেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ে আদালতের এই সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারি কর্মীদের মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে। তবে কর্মীদের একাংশের মধ্যে আশংকা ও রয়েছে, যে রাজ্য সরকার আদৌ ডিএ দেবে, নাকি ফের আদালতে রিভিউ করবে।
বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিতে সুপ্রিম কোর্টের সময়সীমা
সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানিয়েছে যে, মহার্ঘ ভাতা কোনো দয়ার দান বা অনুদান নয়, বরং এটি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে এই ভাতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই বলে আদালত অভিমত প্রকাশ করেছে। রাজ্য সরকার আর্থিক সংকটের যুক্তি খাড়া করলেও আদালত তা গ্রহণ করেনি এবং আগামী ৩১শে মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে ২৫ শতাংশ বকেয়া মেটানোর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আদালতের এই কড়া মনোভাবে রাজ্য প্রশাসনের ওপর চাপ যেমন বেড়েছে, তেমনই কর্মচারীরা তাদের লড়াইয়ের প্রাথমিক জয় হিসেবে একে দেখছেন। এই সময়ের মধ্যে টাকা না মেটানো হলে আদালত কড়া পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।
ডিএ জট কাটাতে উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন
বাকি ৭৫ শতাংশ বকেয়া অর্থ কীভাবে এবং কতদিনের মধ্যে মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব, তা খতিয়ে দেখতে আদালত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার নেতৃত্বে এই কমিটিতে আরও রয়েছেন বিচারপতি তিলক সিং চৌহান এবং বিচারপতি গৌতম মাঘুরিয়া। এই বিশেষ কমিটি রাজ্যের বর্তমান কোষাগারের অবস্থা এবং কর্মচারীদের মোট পাওনার পরিমাণ পর্যালোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করবে। আগামী ৬ই মার্চের মধ্যে এই কমিটিকে তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে। মূলত একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতেই এই নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজ্য সরকারের অবস্থান ও আইনি জটিলতা
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে দাবি করা হয়েছিল যে, একসাথে এত বিপুল পরিমাণ বকেয়া মেটানো বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। সরকারের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেটে এই খাতে বড় কোনো আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়নি যা দিয়ে এই দাবি মেটানো যায়। তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা সংবিধানের আদর্শের পরিপন্থী। সরকারের পক্ষ থেকে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশের পর তাদের পিছু হটতে হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকার অর্থের সংস্থান কীভাবে করে। গতকাল সাংবাদিকদের করা প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী ও আদালতের বিচারাধীন বিষয় বলে, বিষয়টি এড়িয়ে যান।
উপকৃত হবেন লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগী
আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১২ থেকে ২০ লক্ষ বর্তমান কর্মচারী ও পেনশনভোগী সরাসরি লাভবান হতে চলেছেন। বিশেষ করে যারা ২০০৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কর্মরতা ছিলেন, তাদের বকেয়া (DA Arrears) পাওনার পরিমাণ সবথেকে বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক কর্মী ইতিমধ্যে অবসর নিয়েছেন, আদালত তাদের কথাও মাথায় রেখে বকেয়া মেটানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই রায়ের ফলে শিক্ষা দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর এবং প্রশাসনিক বিভাগের নিচুতলার কর্মীদের আর্থিক স্থিতি অনেকটাই মজবুত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় হারের সাথে রাজ্যের ডিএ-র যে বৈষম্য ছিল, তা নিরসনের লক্ষ্যেই এই আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
প্রত্যেকে কত টাকা বকেয়া ডিএ পেতে পারেন?
প্রসঙ্গত এই বকেয়া ডিএ মামলা এপ্রিল ২০০৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রদেয় বেতনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সুতরাং এই সময়ের মধ্যে যে সমস্ত কর্মীরা যে কয় মাস বেতন পেয়েছেন, তারা প্রত্যেক মাসের বকেয়া (DA Arrears) পাবেন। অর্থাৎ কেউ পূর্ণ সময়ে চাকরি করলে পুরো বকেয়া পাবেন। অর্ধেক সময় করলে অর্ধেক বকেয়া পাবেন। প্রতিটি মাসের বকেয়া ডিএ যোগ করেই মোট বকেয়া নির্ধারণ করতে হবে। উদাহরন স্বরূপ, যদি কোনও কর্মচারীর ২০০৮ সালে ২০,০০০ টাকা বেতন হয়ে থাকে, তাহলে হিসাব অনুযায়ী সে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ টাকা ডিএ পাবেন। তবে যেহেতু শীর্ষ আদালত আপাতত ২৫ শতাংশ ডিএ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, তাই সেই হিসাব অনুযায়ী আপাতত তিনি পৌনে ৩ লাখ টাকা বকেয়া ডিএ পেতে পারেন।
১০০% বকেয়া ডিএ এর সম্ভাব্য পরিমাণ
- গ্রুপ ডি কর্মী – প্রায় ৪ লক্ষ টাকা
- গ্রুপ সি কর্মী – প্রায় ৬ লক্ষ টাকা
- গ্রুপ বি কর্মী – প্রায় ৮ লক্ষ টাকা
- গ্রুপ এ কর্মী – প্রায় ১০ লক্ষ টাকা
২৫% বকেয়া ডিএ এর সম্ভাব্য পরিমাণ
- গ্রুপ ডি কর্মী – প্রায় ১ থেকে ১.১৫ লক্ষ টাকা
- গ্রুপ সি কর্মী – প্রায় ২ লক্ষ টাকা
- গ্রুপ বি কর্মী – প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লক্ষ টাকা
- গ্রুপ এ কর্মী – প্রায় ৩ থেকে ৩.৫ লক্ষ টাকা।
পরবর্তী শুনানি ও রাজ্যজুড়ে আন্দোলনের আবহ
ডিএ মামলা নিয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত শুনানি আগামী ১৫ই এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিন বিশেষজ্ঞ কমিটির জমা দেওয়া চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং রাজ্য সরকারের দেওয়া স্ট্যাটাস রিপোর্ট খতিয়ে দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে শীর্ষ আদালত। এদিকে আদালতের নির্দেশের পর রাজ্য সরকারি কর্মীদের বিভিন্ন সংগঠন নতুন করে উৎসাহী হয়ে উঠেছে এবং তাদের দাবি আদায়ে আন্দোলন আরও তীব্র করার পরিকল্পনা করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও কর্মচারীদের মধ্যে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডিএ ইস্যুটি আগামী দিনগুলোতে রাজ্যের অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে থাকবে।