তপসিলি জাতি তথা পিছিয়ে পড়া দলিত জাতিদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে ভারতীয় সংবিধান SC ST OBC Reservation বা তপসিলি জাতি, উপজাতি ও ওবিসি সংরক্ষণের অধিকার দিয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক পরিবারের যুবক যুবতী শিক্ষা, চাকরি ও পেশামূলক কাজে অগ্রসর হয়েছে। একথা নিঃসন্দেহে স্বীকার্য যে, এই সংরক্ষণের ফলে অনেক প্রান্তিক পড়ুয়া উচ্চ শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পেয়েছে। তবে এবার সময়ের প্রয়োজনেই এই সংরক্ষণের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন, দেশের দ্বিতীয় দলিত প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই।
Latest Supreme Court judgement on SC ST OBC Reservation
শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে তপশিলি জাতির (SC) রিজার্ভেশন নিয়ে আজকালকার দিনে অনেক বিতর্ক চলছে। দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই সম্প্রতি এই বিষয়ে স্পষ্ট মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যারা ইতিমধ্যে অবস্থাপন্ন হয়ে গেছে, তাদের আরও সুবিধা দেওয়া ঠিক নয়। এটা যেন তেল মাখা মাথায় আবার তেল ঢালার মতো। এই কথা তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বলেছেন। এতে SC ST OBC Reservation তথা কোটা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যকে নতুন করে চিন্তা করার দরকার দেখা যাচ্ছে। সত্যি বলতে, এই মতামত অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রশ্ন যখন জাতিবাদ ও সংরক্ষণের সেখানে বিতর্ক থাকবেই। তবে এই সিদ্ধান্ত আদৌ কার্যকর হলে কোটা সিস্টেমের সংস্কার প্রয়োজন পড়বে।
প্রধান বিচারপতির যুক্তি ও SC ST রিজার্ভেশনের ইতিহাস
তপশিলি জাতি এবং উপজাতির জন্য রিজার্ভেশনের ধারণা ভারতের সংবিধান থেকে উদ্ভূত। কারন বছরের পর বছর ধরে দলিত শ্রেণীর মানুষেরা শিক্ষা, ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ও ব্রাত্য ছিলো। আর সমাজের একটি অংশ কে ব্রাত্য রেখে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাই SC ST OBC Reservation ছিল দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষদের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু আজকের দিনে এই সুবিধা কিছু ধনী পরিবারের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ ওঠছে।
প্রধান বিচারপতি গাভাই এর মতে, SC ST OBC Reservation নিয়ে অনেকেই যারা চাকরি পেয়ে উন্নত হয়েছেন। তাদের পরবরতুই প্রজন্ম ও ভালো পরিবেশ পেয়ে তারাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবার জন্মসূত্রে তারা SC ST OBC হওয়ায়, তারা ও তপসিলির সুবিধা পাচ্ছে। এবার প্রতিযোগিতায় সেই প্রান্তিক তপসিলিদের যারা ভালো স্কুল কলেজে পড়তে পারেনি, সেই সমস্ত তপসিলি পড়ুয়ারাই অবস্থাপন্নদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে। আসলে প্রান্তিক শ্রেণী প্রান্তিকই থেকে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছে, রাজ্যগুলো SC এবং ST-এর মধ্যে উপশ্রেণি তৈরি করতে পারে। এতে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অংশকে আলাদা সংরক্ষণ দেওয়া যাবে। প্রধান বিচারপতি গাভাই সেই বেঞ্চের সদস্য ছিলেন। তাঁর মতে, এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কিন্তু এখনও অনেক রাজ্য এই নিয়ম কার্যকর করেনি। ফলে বিতর্ক চলতেই থাকে।
আরও পড়ুন, আপনার SIR Enumeration Form এর স্ট্যাটাস অনলাইনে দেখে নিন এইভাবে
অবস্থাপন্নদের বাদ দেওয়ার পক্ষে কেন?
তপশিলি জাতির ধনী সন্তানরা আজকাল ভালো স্কুলে পড়ে এবং ভালো চাকরি করে। তাদের জন্য আরও রিজার্ভেশন দেওয়া অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিচারপতি। একজন IAS অফিসারের ছেলে এবং একজন কৃষকের ছেলের মধ্যে পার্থক্য আছে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা এখনও সংগ্রাম করছে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে ক্রিমি লেয়ার বাদ দিতে হবে। এতে সংরক্ষণের সত্যিকারের উদ্দেশ্য সফল হবে। অনেক সমাজসেবী এই মতের সমর্থন করছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতীতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে এই কথা বলেছেন প্রধান বিচারপতি। ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য লিভিং কনস্টিটিউশন অ্যাট সেভেন্টি ফাইভ ইয়ার্স’ নামক এই অনুষ্ঠানে তিনি সংবিধানের ৭৫ বছর নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে মণ্ডল কমিশনের রায়েরও উল্লেখ করেছেন। OBC-এ ক্রিমি লেয়ারের ধারণা সেখান থেকে এসেছে। SC/ST-এও তা প্রয়োগ করা উচিত বলে তিনি জোর দিয়েছেন। এই মতামত তাঁর অবসরের ঠিক আগে এসেছে। তাই এর গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
রিজার্ভেশন নিয়ে ২০২৪ এর সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়
সুপ্রিম কোর্টের সাত বিচারপতির বেঞ্চ ২০২৪ সালে একটি বড় রায় দেয়। এতে SC/ST-এর মধ্যে অনগ্রসর অংশকে আলাদা করার অনুমতি দেওয়া হয়। রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নীতি তৈরি করতে। এতে ধনী এবং গরিব অংশের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে এই বেঞ্চ কাজ করেছিল। গাভাই সেই সময় সদস্য ছিলেন। এই রায় অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কিন্তু এটি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সঙ্গত করবে।
উক্ত রায়ে বলা হয়েছে, তপশিলি জাতির অবস্থাপন্ন অংশকে চিহ্নিত করে বাদ দিতে হবে। এতে প্রান্তিক মানুষরা সত্যিকারের সুবিধা পাবে। অনেক রাজ্য এখনও এই নিয়ম বাস্তবায়ন করছে না। ফলে আদালতের নির্দেশ অমান্য হচ্ছে। বিচারপতি গাভাই বলেছেন, এটি একটি জরুরি পদক্ষেপ। তাঁর মতে, এতে সামাজিক ন্যায়বিচার সত্যি হবে। এই রায় SC/ST কোটা নিয়ে নতুন আলোড়ন তুলেছে। সরকারকে এখন কাজ করতে হবে।
রাজ্যগুলোর ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রভাব
রাজ্য সরকারগুলোকে এখন তপশিলি জাতির তালিকা আপডেট করতে হবে। এতে কোন অংশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে তা দেখতে হবে। ক্রিমি লেয়ারের মতো ব্যবস্থা চালু করলে অনেক দরিদ্র পরিবার উপকৃত হবে। প্রধান বিচারপতির এই মতামত রাজ্য নেতাদের চাপে ফেলেছে। অনেকে বলছেন, এটি সংরক্ষণের আসল চেতনাকে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু কিছু লবি এর বিরোধিতা করছে। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। SC ST OBC Reservation নিয়ে এই পরিবর্তন ভারতের সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।
আরও পড়ুন, SC ST OBC তপসিলি ছাত্র ছাত্রীদের বছরে ৪৫০০০ টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে। অনলাইনে আবেদন করুন
বিতর্কের দুই পক্ষ: সমর্থন এবং সমালোচনা
সমর্থকদের যুক্তি
অনেক সমাজবিজ্ঞানী বলছেন, SC/ST রিজার্ভেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দমিত জাতির উন্নয়ন। কিন্তু আজ ৭৫ বছর পরও কিছু অংশ পিছিয়ে আছে। ধনীদের সুবিধা কেড়ে নিলে গরিবরা এগোবে। প্রধান বিচারপতির যুক্তি এখানে খুবই যুক্তিযুক্ত। এটি OBC-এর ক্রিমি লেয়ারের মতোই। সংবিধানের চেতনা এটাই। এতে সামাজিক সমতা বাড়বে। অনেক যুবক এই পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে।
সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি
কিছু নেতা বলছেন, SC/ST-এ ক্রিমি লেয়ার চালু করলে পুরো কোটা দুর্বল হয়ে যাবে। এতে জাতিগত বিভেদ বাড়বে। তপশিলি জাতির সবাই এখনও সমান নয়। ধনী-গরিবের পার্থক্য চিহ্নিত করা কঠিন। রাজ্যগুলোর ক্ষমতা নেই এটি করার। ফলে এই রায় বাস্তবে না হয়ে যাবে। সমালোচকরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক ফন্দি। কিন্তু প্রধান বিচারপতির কথা অগ্রাহ্য করা যায় না। এই বিতর্ক চলতেই থাকবে।
উপসংহার
তপশিলি জাতির রিজার্ভেশন নিয়ে এই আলোচনা ভারতের সামাজিক কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তুলবে। প্রধান বিচারপতি গাভাইয়ের মতামত এক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিযুক্ত। তবে ভোটের বাজারে এই পরিবর্তন বা সংস্কার আদৌ সম্ভব কিনা প্রশ্ন থেকে যায়।