পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় নারী কল্যাণমূলক জনহিতকর প্রকল্প হলো । লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প (Lakshmir Bhandar). রাজ্যের মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং তাঁদের হাতে সরাসরি নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সাম্প্রতিক বাজেটে রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের ভাতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার ঘোষণা করেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলার অসংখ্য গৃহবধূ এবং শ্রমজীবী নারী এই সরকারি সুবিধার মাধ্যমে নিজেদের ছোটখাটো প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। আপনি যদি এখনো এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত না হয়ে থাকেন, তবে দ্রুত আবেদনের পদ্ধতিটি আপনার জেনে নেওয়া উচিত।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের নতুন ভাতার পরিমাণ ও সুবিধা
রাজ্য সরকারের অন্তর্বর্তী বাজেটের ঘোষণা অনুযায়ী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের মাসিক ভাতার পরিমাণ বর্তমানে অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। এখন সাধারণ শ্রেণির মহিলারা প্রতি মাসে ১,০০০ টাকার পরিবর্তে ১,৫০০ টাকা হারে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভাতা পাচ্ছেন। অন্যদিকে, তপশিলি জাতি (SC) ও তপশিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ের মহিলাদের জন্য এই ভাতার পরিমাণ ১,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৭০০ টাকা করা হয়েছে। এই আর্থিক সহায়তা মহিলাদের প্রতিদিনের হাতখরচ এবং পারিবারিক ছোটখাটো প্রয়োজনে বিশাল এক ভরসার জায়গা তৈরি করেছে। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীদের জীবনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।
আবেদন করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতামান
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে (লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প (Lakshmir Bhandar).আবেদন করার জন্য রাজ্য সরকার কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। প্রথমত, আবেদনকারিণীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং তাঁর বয়স ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য যদি সরকারি চাকরি করেন বা নিয়মিত সরকারি পেনশন পান, তবে সেই পরিবারের মহিলারা এই সুবিধার জন্য যোগ্য হবেন না। আবেদনকারীর নিজের নামে একটি সক্রিয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে যেখানে সরাসরি প্রকল্পের টাকা জমা হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য সাথী কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক ছিল, তবে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আধার কার্ড থাকলেও আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। উপযুক্ত বয়সের মহিলারা এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করে নিজেদের আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারেন।
আবেদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের তালিকা
এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে আবেদনপত্রের সাথে বেশ কিছু জরুরি নথির প্রতিলিপি বা জেরক্স কপি জমা দিতে হয়। প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে সবার আগে প্রয়োজন আবেদনকারিণীর এক কপি রঙিন পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং আধার কার্ডের ফটোকপি। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের জেরক্স এবং আবেদনকারীর নিজস্ব ব্যাংক পাসবুকের প্রথম পাতার পরিষ্কার ছবি দিতে হবে। যদি আবেদনকারিণী তপশিলি জাতি বা উপজাতি ভুক্ত হন, তবে অবশ্যই তাঁর জাতিগত শংসাপত্র বা কাস্ট সার্টিফিকেটের কপি যুক্ত করতে হবে। সমস্ত নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই করে তবেই আবেদনপত্রটি পূর্ণাঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মনে রাখবেন, জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট বা অন্য কারো অ্যাকাউন্ট এই প্রকল্পের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আবেদন করার সঠিক পদ্ধতি
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প ফর্ম (লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প (Lakshmir Bhandar Form) বা আবেদন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে বেশ সহজ রাখা হয়েছে। মহিলারা সরাসরি তাঁদের নিকটবর্তী ‘দুয়ারে সরকার’ ক্যাম্পে গিয়ে বিনামূল্যে এই আবেদনের ফর্ম সংগ্রহ করতে পারেন। ফর্মটি হাতে পাওয়ার পর আবেদনকারিণীকে তাঁর নাম, ঠিকানা, আধার নম্বর এবং ব্যাংক ডিটেইলস অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পূরণ করতে হবে। ফর্ম পূরণের পর নির্দিষ্ট জায়গায় স্বাক্ষর করে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র সংযুক্ত করে সেই ক্যাম্পেই জমা দিতে হবে। ক্যাম্প থেকে আবেদন জমা নেওয়ার পর একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ দেওয়া হয়। এটি যত্ন করে রেখে দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আবেদনের স্থিতি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন, প্রতিমাসে ১৫০০ টাকা বেকার ভাতা। বাংলার যুব সাথী প্রকল্প আবেদন, যুব সাথী প্রকল্প কারা পাবে?
লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প অনলাইন আবেদন
আপনি যখন দুয়ারে সরকার ক্যাম্পে আবেদনপত্র জমা দেবেন, তখন সরকারি আধিকারিকরা প্রাথমিক পর্যায়ে আপনার নথিগুলি পরীক্ষা করে দেখবেন। এরপর সেই তথ্যগুলি ব্লক বা মহকুমা স্তরে বিডিও (BDO) অথবা এসডিও (SDO) অফিসের মাধ্যমে পুনরায় ডিজিটালভাবে যাচাই করা হবে। সমস্ত তথ্য এবং নথিপত্র নির্ভুল প্রমাণিত হলে জেলাশাসকের অনুমোদনের পর আপনার নাম চূড়ান্ত তালিকায় নথিভুক্ত হবে। তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে সরাসরি আপনার লিংক করা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভাতার টাকা পৌঁছে যাবে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আবেদনকারীকে এসএমএস-এর মাধ্যমেও আবেদনের বর্তমান অবস্থা বা পেমেন্ট সংক্রান্ত তথ্য মাঝেমধ্যে জানানো হয়। কোনো কারণে আবেদন বাতিল হলে তা সংশোধন করারও সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে।
প্রকল্পের গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প (Lakshmir Bhandar Scheme).কেবল একটি সাধারণ ভাতা প্রদান কর্মসূচি নয়, এটি বাংলার নারী সমাজের আত্মসম্মান বৃদ্ধির একটি প্রতীক। এর মাধ্যমে মহিলারা তাঁদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে কারো মুখাপেক্ষী না থেকে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে পারছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদের সঞ্চার ঘটাতে এই প্রকল্প এক অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে যা সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাকেও সচল রাখছে। রাজ্যের কোটি কোটি মহিলা বর্তমানে এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়ে স্বনির্ভরতার পথে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন। সরকারের এই নিরন্তর প্রয়াস আগামী দিনে নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিশা দেখাবে বলে মনে করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা বজায় রেখে এই সুবিধা প্রতিটি যোগ্য মহিলার কাছে পৌঁছে দেওয়াই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।