বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতেই কেন্দ্র সরকারের প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা (PM Matru Vandana Yojana) চালু করে দিলো। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েরা ৫ থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন। এছাড়া তার সাথে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ৩০০০ টাকা ও পাবেন। এই প্রকল্পে কিভাবে আবেদন করবেন, কি কি নথি লাগবে, কি কি শর্ত রয়েছে, বিস্তারিত জেনে নিন।
PM Matru Vandana Yojana in West Bengal
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে একাধিক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প চালু করা হয়েছে। শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সুবিধার্থে এই সমস্ত স্কিম বা যোজনাগুলি ডিজাইন করা হয়। বিশেষ করে মহিলাদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে চিকিৎসা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় প্রশাসন। আজ আমরা এমনই এক যুগান্তকারী উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব যার নাম হলো প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা।
এই বিশেষ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো দেশের গর্ভবতী মহিলা এবং সদ্য মায়েদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বহু মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার এই কেন্দ্রীয় অনুদানের মাধ্যমে দারুণভাবে উপকৃত হচ্ছেন এবং নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করতে পারছেন।
গর্ভবতী মহিলাদের আর্থিক সহায়তা
সাধারণত গর্ভাবস্থায় শারীরিক অসুস্থতা এবং মাতৃত্বকালীন ক্লান্তির কারণে অনেক কর্মজীবী মহিলাই নিয়মিত কাজ বা শ্রম দিতে পারেন না। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ব্যক্তিগত আয় বন্ধ হয়ে যায় অথবা পরিবারের সামগ্রিক উপার্জনে বড়সড় টান পড়ে। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের এই চরম আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করেই কেন্দ্রীয় সরকার এই অর্থ সাহায্যের বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গর্ভবতী মহিলাদের পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো হয়। প্রথম সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগ্য মায়েদের মোট পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়ে থাকে। অন্য দিকে যদি কোনো দম্পতির দ্বিতীয় সন্তানটি কন্যা সন্তান হয় তবে তারা আরও বেশি পরিমাণ সরকারি অনুদান পান।
প্রথম সন্তান হলে কত টাকা পাবেন?
প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনার অধীনে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ উপভোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে প্রদান করা হয়। এই টাকা সরাসরি উপভোক্তার আধার কার্ডের সাথে সংযুক্ত ব্যাংক বা পোস্ট অফিসের অ্যাকাউন্টে ডিরেক্ট বেনেফিট ট্রান্সফার (DBT) পদ্ধতিতে পৌঁছায়। প্রথম সন্তানের জন্মের সময় যে পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে তা মূলত দুটি আলাদা কিস্তিতে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রথম কিস্তির তিন হাজার টাকা পাওয়া যায় যখন কোনো মহিলা তার গর্ভাবস্থার কথা নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রথম নথিভুক্ত করেন। এর পর সন্তানের জন্মের পর এবং নবজাতকের প্রাথমিক টিকাকরণের প্রথম সাইকেল সম্পূর্ণ হলে বাকি দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই সুনির্দিষ্ট নিয়মের কারণে মা ও শিশু উভয়েরই প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক নেওয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
দ্বিতীয় সন্তান কন্যা হলে কত টাকা পাবেন?
এই সরকারি প্রকল্পের অন্যতম একটি চমৎকার এবং ইতিবাচক দিক হলো কন্যা ভ্রূণ হত্যা রোধ এবং কন্যাসন্তান লালন-পালনকে উৎসাহিত করা। যদি কোনো যোগ্য পরিবারের দ্বিতীয় সন্তানটি একটি কন্যাসন্তান বা মেয়ে হয় তবে কেন্দ্রীয় সরকার আরও বড় আর্থিক সাহায্য দেয়। এই বিশেষ ক্ষেত্রে প্রসূতি মায়েদের এককালীন মোট ছয় হাজার টাকা সরাসরি কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়ে থাকে। দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে এই সম্পূর্ণ অর্থটি কোনো কিস্তি ছাড়াই একেবারে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরিবারে কন্যাসন্তানের আগমনকে উদযাপন করতে এবং তার পুষ্টির দেখভাল করতেই মূলত এই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই সুবিধার ফলে গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলি মেয়েদের অবহেলা না করে তাদের সঠিক যত্ন নিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
আবেদনের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শর্তাবলী
প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনার সুবিধা পেতে গেলে আবেদনকারীকে অবশ্যই নির্দিষ্ট কিছু সরকারি শর্তাবলী এবং নিয়ম পূরণ করতে হবে। এই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আর্থিক অনুদান পাওয়ার জন্য আবেদনকারী মহিলার ন্যূনতম বয়স অবশ্যই ১৯ বছর বা তার বেশি হতে হবে। আবেদনকারীকে অবশ্যই একজন গর্ভবতী মহিলা অথবা সদ্য মা হতে হবে যিনি গর্ভাবস্থার কারণে নিজের নিয়মিত কাজ বা রোজগার হারিয়েছেন। তবে মনে রাখতে হবে যে সব নারী কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের স্থায়ী পদে কর্মরত তারা এই সুবিধা পাবেন না। এমনকি যেকোনো সরকারি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বা পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংয়ে কর্মরত মহিলারাও এই স্কিমের আওতাভুক্ত হতে পারবেন না। মূলত অসংগঠিত ক্ষেত্রের দিনমজুর বা দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতেই এই নিয়মাবলী তৈরি।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
এই আকর্ষণীয় সরকারি স্কিমের জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ এবং সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে বেশ সুলভ রাখা হয়েছে। আবেদন করার সময় আবেদনকারী প্রসূতি মায়ের নিজস্ব আসল আধার কার্ডের জেরক্স কপি জমা দেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মা ও শিশুর সঠিক স্বাস্থ্যের হিসাব রাখার জন্য তৈরি হওয়া মাদার অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন কার্ড লাগবে। অনুদানের টাকা সরাসরি পাওয়ার জন্য আবেদনকারীর আধার লিংকড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (DBT) অথবা পোস্ট অফিস পাসবুকের প্রথম পাতার কপি প্রয়োজন।
কিভাবে আবেদন করবেন?
অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই আজকাল এই যোজনার অফিশিয়াল পোর্টাল বা ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন ফর্ম পূরণ করা সম্ভব। তাছাড়া যারা ইন্টারনেটে অভ্যস্ত নন তারা সরাসরি স্থানীয় অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বা নিকটবর্তী সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুস্থ ভবিষ্যৎ গঠনে সরকারি প্রকল্পের ভূমিকা
সর্বোপরি বলা যায় যে প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা দেশের মা ও শিশুদের পুষ্টির মান উন্নয়নে এক অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে। সঠিক সময়ে পুষ্টিকর খাবার এবং উন্নত চিকিৎসার অভাবে অতীতে বহু নবজাতক ও প্রসূতি মা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সময়োপযোগী অর্থনৈতিক অনুদান দেশের দরিদ্র পরিবারগুলির উপর থেকে চিকিৎসার বাড়তি মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। আধার নির্ভর সরাসরি টাকা ট্রান্সফার ব্যবস্থার ফলে কোনো রকম মধ্যস্বত্বভোগী বা দালের খপ্পরে পড়ার ভয় ছাড়াই মায়েরা টাকা পাচ্ছেন। আপনিও যদি এই স্কিমের সমস্ত শর্ত পূরণ করে থাকেন তবে আজই প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে এই ধরণের আধুনিক ও কল্যাণমুখী চিন্তাভাবনা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সুস্থ ও সবল করে তুলবে।