রাজ্যের কৃষি ব্যবস্থায় ডাল চাষ তথা Pulses Production নিয়ে এক নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে। প্রথাগত ধান চাষের পরিবর্তে ডাল জাতীয় শস্য চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় কৃষি দপ্তর। কেন্দ্র সরকারের ডাল আত্মনির্ভর প্রকল্প কে সামনে রেকে নতুন উদ্যোগ কৃষি মন্ত্রকের। কৃষি আধিকারিকদের মতে, বছরে অন্তত একবার জমিতে ডাল চাষ করলে মাটির স্বাস্থ্য আমূল বদলে যেতে পারে। এর ফলে কেবল ফলনই বাড়বে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী চাষাবাদে মাটির প্রাণশক্তি ফিরে আসবে। আধুনিক কৃষিতে এই পদ্ধতিকে মাটির পুষ্টি ফেরানোর মহৌষধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে আমরা জানব ডাল চাষের বহুমুখী সুবিধা ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সম্পর্কে।
Pulses Production – ডাল চাষের উপকারিতা ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাল জাতীয় শস্যের শিকড়ে ‘রাইবোজিয়াম’ নামক এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এই উপকারী অণুজীব বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে সরাসরি মাটিতে মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়। সাধারণত ধান বা অন্য চাষে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু জমিতে ডাল চাষ তথা Pulses Production করলে মাটি প্রাকৃতিকভাবেই নাইট্রোজেনে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে পরবর্তী ফসলের জন্য সারের খরচ অনেকটাই কমে আসে কৃষকদের। মাটির গুণমান ধরে রাখতে ডাল চাষের কোনো বিকল্প নেই বলে জানাচ্ছেন আধিকারিকরা।
চাষিদের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
মথুরাপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার অনেক কৃষকই এখন ডাল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তবে অনেক সময় কৃষকরা অভিযোগ করেন যে, ডাল জাতীয় শস্য লাগিয়েও তারা কাঙ্ক্ষিত ফলন পাচ্ছেন না। কিছু ক্ষেত্রে গাছ ঠিকমতো বড় হচ্ছে না অথবা অকালেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষি সম্মেলনে উপস্থিত কৃষকরা তাদের এই সমস্যার কথা কৃষি আধিকারিকদের কাছে তুলে ধরেছেন। সঠিক পদ্ধতি না মানলে ডাল চাষে লাভের মুখ দেখা কঠিন হতে পারে। তাই চাষিদের এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরি।
রোগ-বালাই দমন ও বৈজ্ঞানিক কৃষি সমাধান
অ্যাসিস্ট্যান্ট কৃষি প্রযুক্তি সহায়ক অতনু দে এবং এএইও রাজু রায়ের মতে, ডাল শস্যের কিছু সাধারণ রোগ ফলন কমিয়ে দেয়। এর মধ্যে গোড়া পচা, পাতা ঝলসানো এবং মোজাইক ভাইরাস অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনেক সময় কৃষকরা পর্যাপ্ত পরিমাণ সার দিলেও সঠিক সময়ে তা না দেওয়ায় ফসল মার খায়। কৃষি আধিকারিকরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, ডাল চাষে রাসায়নিক সারের বদলে জীবাণু সার ব্যবহার করা বেশি কার্যকর। এতে গাছ নিজের প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেন নিজেই তৈরি করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।
সঠিক সার প্রয়োগ ও বিশেষজ্ঞদের বিশেষ টিপস
ডাল জাতীয় ফসলে নাইট্রোজেন সারের প্রয়োজনীয়তা অন্যান্য শস্যের তুলনায় অনেকটাই কম থাকে। তবে একেবারেই নাইট্রোজেন লাগবে না—এমন ধারণা পোষণ করা ভুল বলে জানিয়েছেন কৃষি আধিকারিকরা। মাটির ঘাটতি মেটাতে বাজারের উন্নত মানের রাইবোজিয়াম কালচার কিনে এনেও জমিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গাছের বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে সারের ভারসাম্য বজায় রাখলে ফলন নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে চাষিদের উৎপাদন খরচ যেমন কমবে, তেমনি লাভের পরিমাণও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
সফল চাষাবাদের জন্য কৃষি দপ্তরের প্রচারণা
কৃষকদের সচেতন করতে কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরে এই ধরণের কর্মশালাগুলি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কৃষি দপ্তরের লক্ষ্য হলো কৃষকদেরকে একমুখী চাষবাস থেকে বের করে এনে বৈচিত্র্যময় কৃষিতে অভ্যস্ত করা। মাটির চরিত্র অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করলে কৃষিকাজ অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। সম্মেলনে উপস্থিত কৃষি আধিকারিকরা চাষিদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়িয়ে তুলছেন। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও উন্নত বীজের গুরুত্বও সেখানে আলোচিত হচ্ছে।
কেন বছরে একবার ডাল চাষ করা জরুরি?
সারাবছর ধরে একই জমিতে বারংবার ধান চাষ করলে মাটির উপরিভাগের পুষ্টি উপাদান শেষ হয়ে যায়। মাটির গঠন কাঠামো ঠিক রাখতে ফসলের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন বা ‘ক্রপ রোটেশন’ অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি। ডাল চাষ (Pulses Production) করলে মাটির জল ধারণ ক্ষমতা বাড়ে এবং মাটির ছিদ্রতা ঠিক থাকে। এটি মাটির উপরিভাগে থাকা ক্ষতিকারক পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণ কমাতেও সাহায্য করে। তাই দীর্ঘস্থায়ী কৃষির স্বার্থে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কৃষকদের এই পরামর্শ মেনে চলা প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব উপায়ে অধিক মুনাফা অর্জনের এটিই বর্তমানে সেরা উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপসংহার ও আগামী দিনের সম্ভাবনা
ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করতে ডাল চাষ একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কৃষকরা যদি কৃষি দপ্তরের এই বৈজ্ঞানিক পরামর্শগুলি মেনে চলেন, তবে তাদের আর্থিক শ্রী ফিরবে। মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকলে কৃষকের মুখেও হাসিখুশি ভাব বজায় থাকবে চিরকাল। প্রাকৃতিক উপায়ে মাটির উর্বরতা বাড়িয়ে চাষের খরচ কমানোর এই কৌশল সত্যিই প্রশংসনীয়। আধুনিক ভারতের কৃষি ব্যবস্থায় মথুরাপুরের এই উদ্যোগ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কৃষকদের এই সাফল্য আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলাগুলির জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।